বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এস আলমের ‘আইনি লড়াই’, ব্রিটিশ উকিলদের এক মাসের বিলই ৫ কোটি টাকা

বাংলাদেশে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থপাচার ও বিদেশে সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তদন্ত জোরদার হওয়ার মধ্যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম মাসুদ। এ লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি শীর্ষ আইনজীবী দল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকাভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি ওয়াদা’।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তার হাতে আসা একটি গোপন আইনি বিলের নথিতে আন্তর্জাতিক সালিসি কার্যক্রম, ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দাবি উত্থাপনের প্রস্তুতির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রজেক্ট ভলকান’ নামে একটি কোডনামে পরিচালিত আইনি কার্যক্রমের জন্য গত মে মাসে সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের কাছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৪ দশমিক ৭২ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার বিল পাঠানো হয়।

নথিতে এই কার্যক্রমকে ‘সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও অনুরূপ বিষয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, চলমান তদন্তের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকায় বৈঠক, শত শত ঘণ্টার আইনি প্রস্তুতি

ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিরোধের প্রস্তুতিতে আইনজীবীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে গবেষণা, কৌশল নির্ধারণ, ক্লায়েন্ট বৈঠক, ভ্রমণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগে সময় ব্যয় করেন।

মে মাসে আইনজীবী দলটি মোট ২৬৩ ঘণ্টা ৬ মিনিট বিলযোগ্য কাজ করেছে। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ অংশীদারদের ঘণ্টাপ্রতি ফি ছিল ২ হাজার ৪৫ ডলার (প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার টাকা), কাউন্সেলদের ১ হাজার ৯৫০ ডলার (প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা), সিনিয়র অ্যাসোসিয়েটদের ১ হাজার ৬৩০ ডলার (প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকা), অ্যাসোসিয়েটদের ১ হাজার ৪১০ ডলার (প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা) এবং প্যারালিগ্যালদের ৫৫৫ ডলার (প্রায় ৭৬ হাজার টাকা)।

বিলের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শুরুতে আইনজীবীরা ঢাকায় এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

নথিতে দেখা যায়, ৪ মে একজন অংশীদার একাই ঢাকায় একাধিক বৈঠক, টিম কনফারেন্স ও ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলোচনার জন্য ১৩ ঘণ্টা ৪২ মিনিট বিল করেছেন। পরদিন আরও ৮ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট বৈঠকের হিসাব রয়েছে। সফরের আগে ব্রিফিং উপকরণ প্রস্তুত এবং পরে স্মারকলিপি তৈরিতেও কয়েক দিন ব্যয় করা হয়।

সাবেক ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনজীবীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. জাকির হোসেন চৌধুরী এবং পরিচালক কামাল হোসেনের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এ সময় ব্যাংকিং নথি পর্যালোচনা, আইনি মতামত প্রস্তুত এবং আলোচনার ভিত্তিতে স্মারকলিপি তৈরি করা হয়।

ডেইলি ওয়াদাকে মো. জাকির হোসেন চৌধুরী বলেন, এস আলমের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আলোচনায় বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলো স্থান পায়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে এস আলম গ্রুপের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। এটি ছিল সাধারণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা।

আইসিএসআইডি, আন্তর্জাতিক সালিসি ও রাজনৈতিক মামলার গবেষণা

নথিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র (আইসিএসআইডি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ, সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে গোপন স্মারকলিপি প্রস্তুত, বিনিয়োগ চুক্তিভিত্তিক সালিসি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিষয়ে গবেষণার তথ্যও রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ, চলমান ফৌজদারি মামলার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন আইনি বিকল্প বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যক্রম স্থগিতের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করা হয়েছে বলে বিলের তথ্য থেকে জানা যায়।

তদন্তের বিস্তার দেশে-বিদেশে

ডেইলি ওয়াদা বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযোগ, মনোনীত পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রুপটি একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংকিং বিধি লঙ্ঘন করে গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছিল কি না।

একই সময়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এস আলম পরিবারের সদস্য ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যাংক লেনদেন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সীমান্তপারের অর্থ স্থানান্তর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাইফুল আলম মাসুদ, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার, প্রতারণামূলক ঋণ গ্রহণ ও অর্থপাচারের অভিযোগে একাধিক তদন্ত শুরু করেছে।

সরকারি বিবৃতি ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ডেইলি ওয়াদা জানিয়েছে, বাংলাদেশে সম্পদ জব্দে আদালতের আদেশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়াও চালানো হচ্ছে।

সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২০ বৃহত্তম করপোরেট ঋণখেলাপির মধ্যে ১১টিই এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাওনা কয়েক হাজার কোটি টাকা।

সাইপ্রাসে সম্পদ জব্দ ও আন্তর্জাতিক আইনি কৌশল

প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের অনুরোধে সাইপ্রাসের আদালত সাইফুল আলম মাসুদ ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ থাকা কিছু সম্পদ জব্দ করে। তদন্তকারীরা বিদেশি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে সংঘটিত বলে অভিযোগ থাকা প্রতারণামূলক ঋণ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থপাচারের বিষয়গুলো তারা তদন্ত করছেন।

আইনজীবীদের বিলের নথি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এসব আন্তর্জাতিক তদন্ত ও সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এখন তাদের আইনি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

মে মাসে বিল ৪.৯ কোটি, বকেয়া নিয়ে ৫.৭ কোটি টাকা

নথি অনুযায়ী, মে মাসে মোট আইনি ফি দাঁড়ায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৮০ দশমিক ৫০ ডলার (প্রায় ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা)। ১০ শতাংশ ছাড়ের পর তা কমে হয় ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭২২ দশমিক ৪৫ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা)। ভ্রমণ ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ আরও ৮৬২ দশমিক ২৭ ডলার (প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা) যোগ হলে মোট বিল দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৪ দশমিক ৭২ ডলার বা প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া এপ্রিল মাসের ১ লাখ ৬ হাজার ১৭৩ দশমিক ২৭ ডলারের (প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা) একটি বিল তখনও পরিশোধ হয়নি। ফলে মোট বকেয়া দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৭৫৭ দশমিক ৯৯ ডলার (প্রায় ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা)। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মে মাসের আগেই এই আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।

তবে নথিতে আনুষ্ঠানিক সালিসি কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না বা সমঝোতা আলোচনা চলছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

ডেইলি ওয়াদা জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে যুক্তরাজ্যের আইনজীবী দল এবং সিঙ্গাপুরে থাকা এস আলমের প্রতিনিধির কাছে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের কেউ কোনো জবাব দেননি।

বিষয়টির আইনি সংবেদনশীলতার কারণে আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেনি ডেইলি ওয়াদা।

সিপি

ksrm