বসুন্ধরা ঘিরে জ্বালানি তেলের নীতিমালার খবরকে এখন ‘কাল্পনিক ও অসত্য’ বলছে সরকার
দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা
বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য প্রস্তাবিত নীতিমালা নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন খবর ও আলোচনাকে ‘কাল্পনিক ও অসত্য’ বলে দাবি করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ বলেছে, এই নীতিমালার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

শনিবার (৮ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালা নিয়ে অনুমাননির্ভর ও অসত্য তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা জনগণের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

এর আগে চট্টগ্রাম প্রতিদিনে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ওঠে আসে, বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বিওজিসিএল বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়েছে। আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিশোধিত জ্বালানির বড় অংশ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রভাব বিস্তার, কৃত্রিম সংকট কিংবা মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালার প্রধান উদ্দেশ্য দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানোর বিষয়টিও এতে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত ও সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই নীতিমালা বিবেচনার বিষয় হিসেবে গণ্য হবে।’
বিশেষ সুবিধার গুঞ্জন নাকচ
প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তা সরাসরি নাকচ করেছে মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘এই নীতিমালার মাধ্যমে কোনো বিশেষ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।’
জ্বালানি বিভাগ আরও বলেছে, সম্প্রতি প্রস্তাবিত নীতিমালা নিয়ে কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুমাননির্ভর ও অসত্য তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রচার অনভিপ্রেত উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে বিভাগ।
মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মুহাম্মদ আরিফ সাদেকের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া হবে। জনস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে আনভীরের আবেদন
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি জ্বালানি নীতিমালার আওতায় ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি এবং বিপণনের অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে আবেদন করে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল)।
গত ২৪ মে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অংশীদার হওয়ার লক্ষ্যে বিওজিসিএলকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি দেওয়া হোক।
চিঠিতে দাবি করা হয়, বসুন্ধরা অয়েল প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিজস্ব রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে দেশে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়, দেশের জ্বালানির চাহিদা প্রতিবছর ২ থেকে ৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালে দেশের মোট জ্বালানির চাহিদা প্রায় ৯ থেকে ১০ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে, যার প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের।
বিপিসিকে চার দিনের সময়
১০ দিন আগে এক রাতে হঠাৎ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার পর জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চারদিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এর মধ্যেই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বেসরকারি খাতে চলে গেলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জারি করা এক চিঠিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ১০ আগস্টের মধ্যে ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া জমা দিতে নির্দেশ দেয়। জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আসিফ আহমেদের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত নীতিমালাটি করা হচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আসিফ আহমেদের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত নীতিমালাটি করা হচ্ছে।
সিপি




