বন্যায় বিপর্যস্ত বাঁশখালী, লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, ঢলের স্রোতে দুই শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
পাঁচ দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানি বেড়ে গিয়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়কের বৈলছড়ি অংশ তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। একই দিনে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে মিরাজ ও আশিক নামে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বাহারচড়া ইউনিয়নের পৃথক এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে আশিক দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে। অপর শিশু মিরাজ বাহারচড়া ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দুই শিশু নিজ নিজ বাড়ির উঠানে বের হলে পূর্ব দিক থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই দুজনের মৃত্যু হয়।
এদিকে অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার অন্তত তিন শতাধিক কাঁচা মাটির ঘর তলিয়ে গেছে। প্রশাসন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে কিছু মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হলেও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত থাকায় এবং অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে এখনো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অধিকাংশ বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দৈনন্দিন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে অসংখ্য বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না, কারণ চুলা জ্বালানোর মতো পরিস্থিতিও নেই। পানিবন্দি হয়ে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এ ছাড়া টানা চার থেকে পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দিতে না পেরে অনেক পরিবার স্বজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছে না। বাঁশ, মাটি ও টিন দিয়ে নির্মিত অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, “বাঁশখালীর বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। বুধবার রাত ১১টার দিকে আমাদের উদ্ধারকারী দল কোমরসমান পানিতে নেমে বৈলছড়ি এলাকায় একটি পরিবারের আট নারী ও পাঁচ শিশুসহ মোট ১৩ জনকে দড়ি ও নৌকার সহায়তায় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
বন্যা পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন জরুরি জনসচেতনতামূলক বার্তা দিয়ে নিম্নাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মসজিদে মাইকিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার সকালে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি উপজেলার কালীপুর লাব্বার দোকান এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং জামায়াতের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী, মুহাম্মদ শাহজাহান, চট্টগ্রাম টিম সদস্য জাফর সাদেক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (ভূমি) ওমর সানি আকন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক, ডাকসুর সাবেক জিএস এস এম ফরহাদ, দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, সেক্রেটারি অধ্যক্ষ বদরুল হক, শামসুজ্জামান হেলালীসহ দলীয় ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা।
অন্যদিকে, বাঁশখালীর সংসদ সদস্য এক বিবৃতিতে জানান, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলায় তিনি সরাসরি এলাকায় যেতে না পারলেও সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-ছড়া খনন, স্লুইস গেট সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন স্লুইস গেট নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, “সরকারি ত্রাণসামগ্রী হাতে পেলেই দ্রুত দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও বন্যাকবলিত এলাকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় বাঁশখালীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সিপি




