বন্দর জিম্মির ‘মাস্টারমাইন্ড’ র্যাবের হাতে ধরা, ভোট ও রমজান ঘিরে বড় ‘নাশকতা’র ছক
আন্দোলনের নামে ১০ হাজার কোটির বাণিজ্য স্থবির
লাগাতার ধর্মঘট চালিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করার অন্যতম প্রধান হোতা বিএনপিপন্থী বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনকে আটক করেছে র্যাব। তিনি জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদকও।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বন্দর এলাকা থেকে র্যাবের একটি টিম ইব্রাহিম খোকনকে আটক করে। পরে তাকে বন্দর থানায় সোপর্দ করা হয়। তার আরেক সহযোগী হুমায়ুন কবির বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম নগরের বন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম।
সূত্র জানায়, আন্দোলনের নামে শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে বন্দর অচলের পরিকল্পনা এবং রমজানের আগে জনমনে অসন্তোষ তৈরির পরিকল্পনা করছিল একটি চক্র। হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকনের অন্তত ১৫ জনের একটি চক্র এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
এর আগে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু লোক চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। পোর্টের কর্মচারীরাই অচলাবস্থা তৈরি করছে এবং নির্বাচনকে লক্ষ্য করেই এটি করা হচ্ছে। তবে বন্দর সচল রাখতে সরকার হার্ডলাইনে আছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
টানা সাত দিন দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আটকে দেওয়ার পর মধ্যরাতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইস্যু ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কনটেইনার পরিবহন ও ডেলিভারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে আমদানি–রপ্তানির পুরো শৃঙ্খলে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে অজ্ঞাত স্থান থেকে বিএনপিপন্থী চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের দুই সমন্বয়ক মো. হুমায়ূন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এতে বলা হয়, নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সন্তোষজনক আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য রিলিজের স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘট কর্মসূচি ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাঁচ কর্মচারীকে গ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলা, ১৫ কর্মচারীকে বিভিন্ন বন্দরে বদলি, আন্দোলনরত কর্মচারীদের শাস্তি, বাসা বরাদ্দ বাতিল এবং ১৬ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তসহ যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব সমস্যার সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এর আগে সর্বশেষ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিএনপিপন্থী শ্রমিক–কর্মচারীরা বন্দরের তিনটি টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামাসহ প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে কার্যত অচল হয়ে যায় বন্দর। সকাল থেকে প্রধান জেটিতে থাকা ১২টি জাহাজ ও বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ৮০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে খালাস বন্ধ ছিল। কনটেইনার পরিবহন ও ডেলিভারি কার্যক্রম থেমে যায়। বন্দরের ভেতরে কোনো ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনের যানবাহন ঢুকতে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে অন্তত ৪০ হাজার কনটেইনার ইয়ার্ডে আটকা পড়ে।
বন্দর অচলের নেপথ্যে ১৫ জন
সাধারণ শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করার নেপথ্যে মোট ১৫ শ্রমিক নেতা রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের, কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সঙ্গে যুক্ত। তালিকায় রয়েছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবীর এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন। দুজনই চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক।
এ ছাড়া রয়েছেন পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন ও রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবীর, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী ও খালাসি মো. রাব্বানী।
তালিকায় আরও আছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল।




