বন্দর অচলের ‘হোতা’ ১৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ, দুদক খুঁজবে সম্পদ

৬ দিনে ৮ হাজার কোটির ব্যবসা আটকা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে পরিকল্পিত আন্দোলনের নামে ছয় দিন ধরে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর অচল করে দেওয়ার ঘটনায় এবার কড়া পথে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ওই কর্মসূচির নেপথ্যে নেতৃত্ব দেওয়া ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের স্থাবর–অস্থাবর সম্পদের উৎস ও পরিমাণ তদন্তের প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বদলির আদেশের পরও তারা সাধারণ শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে বন্দর অচল করে প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আটকে দেন।

বন্দর অচলের ‘হোতা’ ১৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ, দুদক খুঁজবে সম্পদ 1

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা চিঠিতে ওই ১৫ কর্মচারীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও সম্পদ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)কে অবহিত করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ১৫ জনের সবাই বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। তাদের কয়েকজনকে আগে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হলেও সেখান থেকে আন্দোলনে উসকানি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচলের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এনসিটি থেকে বিতাড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক ও এর মালিক তরফদার রুহুল আমীনের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যারা নিষেধাজ্ঞার তালিকায়

দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ জানানো তালিকায় রয়েছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন। দুজনই চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক।

এ ছাড়া রয়েছেন পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন, রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবির, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী এবং যান্ত্রিক বিভাগের খালাসি মো. রাব্বানী।

তালিকায় আরও আছেন মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল। তাদের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য, কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য হিসেবে যুক্ত।

চিঠিতে কী বলা হয়েছে

‘আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কর্মচারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ তদন্তকরণ’ শীর্ষক চিঠিতে বলা হয়, বন্দরে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২ ফেব্রুয়ারি এসব কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তদন্তাধীন অবস্থায় তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তাদের সম্পদের উৎস ও পরিমাণ যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দুদকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ বিষয়ে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসার নাসির উদ্দিন চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করেন।

ছয় দিনে আট হাজার কোটির বাণিজ্য আটকে

এনসিটি বিদেশি কোম্পানির হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক আন্দোলনের নামে টানা কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দর। রপ্তানি–আমদানি থেমে গিয়ে হাজার হাজার কনটেইনার আটকে পড়ে। ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায়।

শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করা হয়। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বন্দর ছিল কার্যত অচল। আগের দিন বুধবারও আন্দোলনকারীদের বাধায় কোনো জাহাজ জেটি ছাড়তে পারেনি। বন্দর চত্বর, জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ ও বেসরকারি ডিপোতে আটকে পড়ে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার। এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬৬ কোটি ডলার।

অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুই দিনের জন্য লাগাতার কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দেয় বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বন্দর ভবনে বৈঠকের পর এ ঘোষণা আসে। তবে আশ্বাস অনুযায়ী ব্যবস্থা না হলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা জানান, শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল নাগাদ বন্দর পুরোপুরি সচল না হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।

উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে বিরতি

অচলাবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রাম বন্দরে যান। চার নম্বর গেটের বাইরে আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। পরে বিকেলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক হয়।

বৈঠক শেষে সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে না দেওয়া, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগসহ চারটি দাবি উপদেষ্টার কাছে তোলা হয়েছে। নিউমুরিং টার্মিনাল বিষয়ে উপদেষ্টা উচ্চপর্যায়ে কথা বলবেন এবং অন্য দাবির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। এ কারণে শনিবার পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। শনিবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে রোববার থেকে আবার কর্মসূচি শুরু হবে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ চট্টগ্রামের যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান বলেন, শ্রমিক নেতাদের বদলির বিষয়টি উপদেষ্টা দেখবেন এবং এনসিটি ইজারা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে। আপাতত দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে।

ksrm