বউ-বাচ্চার বাবাও ‘ব্যাচেলর’ সেজে চট্টগ্রাম উত্তর ছাত্রলীগের পদে

পদের জন্য এখন বউ-বাচ্চাকেই অস্বীকার

0

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন গঠনতন্ত্রে লেখা ছিল, ‘কোনো বিবাহিত, চাকরিজীবী ও অছাত্র ছাত্রলীগ করতে পারবে না’। তবে বর্তমান ছাত্রলীগ যেন ঠিক তার উল্টো। বিবাহিত, চাকরিজীবী এমনকি অছাত্রকে নিয়ে ঠাসা কমিটিগুলো। তেমনই একটি ‘সম্প্রীতি কমিটি’ উত্তর জেলা ছাত্রলীগের। সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সব অযোগ্য ছাত্রনেতায় ভরা। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাদের সুপারিশে অনেকে পদ পেয়েছে এ কমিটিতে। ঘরে বউ থাকার পর তারা নিজেদের ব্যাচেলর পরিচয় দিচ্ছেন, আবার অনেকে বাচ্চার বাবা হওয়ার পরও পদবির লোভে তা অস্বীকার করছেন।

গত ৩১ জুলাই রাত ১১টা ৫০ মিনিটে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের ৩১৬ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাম্বো’ কমিটি ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র থেকে। কমিটির রেশ ধরে শোকের মাস আগস্টে কেউ করছেন আনন্দ, আবার পদবঞ্চিতরা করছেন বিক্ষোভ। উত্তরের নেতাদের এই সুখ-সংগ্রামে মাটিচাপা পড়েছে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর শোক। এ নিয়ে সংগঠনটির সাবেক নেতাসহ অনেকেই ক্ষোভ ঝেড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিবাহিত ছাত্রনেতাদের পদে আনা হয় এই উত্তর জেলার কমিটিতে। উত্তরের একটি উপজেলা ফটিকছড়ি, সব থেকে বেশি বিবাহিত নেতা এসেছে এখান থেকে। এ উপজেলা থেকে নেতা হয়েছেন অন্তত ১২ জন বিবাহিত পুরুষ। তাদের অনেকের রয়েছে একাধিক বউ, বাচ্চাও।

তবে পদ পাওয়ার পর তারা অস্বীকার করছেন নিজেদের বউ-বাচ্চাকে। ঘটা করে বিয়ে করার পরও তারা ভুলে গেছেন কবে বিয়ে করেছেন। বিবাহিতদের এমন আচরণে ক্ষোভে জ্বলছেন পদবঞ্চিতরা। পদওয়ালা বিবাহিতরা পদ ছাড়ুক, নয়তো বউ—এমন দাবিও উঠেছে।

নাজমুল অভি ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। এরপর সদ্য ঘোষিত উত্তর জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে হয়েছেন আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক। কমিটি ঘোষণার আগে ধুমধাম করে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। বিয়েতে উত্তর জেলার বড় বড় প্রায় সকল নেতাদের দাওয়াতও দেন। সেই অভিই এখন উত্তর জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক।

Yakub Group

তবে অভির দাবি, সিভি জমা দেওয়ার পরই তিনি বিয়ে করেছেন। তিনি যে বিয়ে করেছেন এটা কেন নিউজ করতে হবে— উল্টো জানতে চান প্রতিবেদকের কাছে। বিবাহিতরা ছাত্রলীগের পদে থাকতে পারেন না— এই বিধানটি তিনি জানেন কি-না জিজ্ঞেস করলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তবে অভির তো শুধুমাত্র একটি বৌ রয়েছে, একাধিক বিয়ে করা যুবককেও বানানো হয় সহ-সভাপতি। প্রথম বৌয়ের সাথে ডির্ভোসের পর দ্বিতীয় বিবাহের পরই ভাগ্য খুলে উত্তর মার্দাশা এলাকার আফরানুল হকের, হয়েছেন সহ-সভাপতি।

একইভাবে বিয়ের পর পদ পেয়েছেন ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের মেম্বার মোরশেদের। নেতা হয়েছেন তিনি, পেয়েছেন পদ। তবে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের কাছে বিয়ের কথা অকপটে স্বীকার করে নেন তিনি।

তিনি বলেন, এই নামে দুজনের কথা বলা হচ্ছে, এটা আমিও হতে পারি, না ও হতে পারি। তবে আমি শিওর না এটা আমি কি না।

তবে তিনি নিশ্চিত না হলেও নিশ্চিত হয়েছেন মোরশেদের কর্মীরা। অভিনন্দনের জোয়ার ভাসছেন মোরশেদ।

ফটিকছড়ির সন্তান মিজানুর রহমান একদিকে যেমন বিবাহিত, তেমনি তিনি সরকারি চাকরিজীবীও। স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিয়নের চাকরি করেন তিনি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনি নাকি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পরিচয় দিয়ে বিয়ে করেছেন। তবে তিনি অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন।

অভিযোগের বিষয়ে মিজানুর রহমানকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রথমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করার পর তিনি জানান, এগুলো তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তিনি কখনোই সরকারি স্কুলে চাকরি করেন নি। তিনি বেসরকারি একটি স্কুলে চাকরি করেছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

তিনিও নিজের পদ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন। তার দাবি, এই নামের দু’জন পদটি দাবি করছেন। তারপরও তাকে অভিনন্দন জানাতে ভুল করেননি কর্মীরা।

মিজান লেখাপড়া ছেড়েছেন অনেক আগেই। বর্তমানে তিনি ছাত্র নন—স্থানীয়দের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও লেখাপড়া করছি আমি।’ এইচএসসি কততম ব্যাচ— জানতে চাইলে মিজান ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে আরও একবার ফোন দিলে তিনি মোবাইলটি স্থানীয় এক ফার্মেসির দোকানদারকে ধরিয়ে দেন।

শুধু অভি, মিজান বা মোরশেদই নন। বিয়ে করেও সহ-সভাপতি হয়েছেন সাদেক আলী সিকদার। তার বিরুদ্ধে অবৈধ মাটি উত্তোলনের সিন্ডিকেট পরিচালনাসহ অছাত্র ও বিবাহিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আদিল চৌধুরী পেয়েছেন উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতির পদ। অথচ তিনি বিবাহিত। একই অবস্থা হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শার বাসিন্দা আরনাফুল হকের। ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির পদ পেলেও তিনি যোগ্যতা হারিয়েছেন অনেক আগে। গত ২১ সেপ্টেম্বর তিনি বিয়ে করলেও চাচা নূর খান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হওয়ার সুবাদে ক্ষমতার দাপট কাজে লাগান তিনি।

হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শার হাসান মাহমুদ তানভীর শাহও পদ পেয়েছেন একইভাবে। ছাত্রত্ব নাই, তার ওপর বিয়ে করেছেন গত ১০ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু চাচা জসিম উদ্দিন শাহ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলে কথা। তাই সহ-সভাপতির পদ বাগিয়ে নিতে তার কোনো অসুবিধা হয়নি।

উত্তর জেলার উপ-দপ্তর সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় জাতীয় পার্টির সভাপতির ছেলে দুই সন্তানের জনক আবদুল্লাহ্ আল আরিফ। আরিফের স্ত্রীর একটি বিউটি পার্লারও রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন বোরহান উদ্দিন। বিবাহিত হওয়ার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা আছে বলে জানা গেছে।

ফটিকছড়ি ৮ নম্বর রোসাংগিরি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আনিসুল ইসলাম। বর্তমানে লেখাপড়া বাদ দিয়ে জনসেবা করে তিনি বাগিয়ে নেন উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক পদ।

লেখাপড়া বাদ দিয়ে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করছেন মো. আবদুল হান্নান। তিনিও হয়ে গিয়েছেন উত্তর জেলা ছাত্রলীগের উপ-ছাত্র বৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক।

এছাড়া নিজের নাম লিখতে না পারার অভিযোগ ওঠে উপ-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদকের পদ পাওয়া আজম খানের বিরুদ্ধে। তিনি স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী বলেই পরিচিত। নিরক্ষর আজম এখন নেতৃত্ব দেবেন উত্তর জেলার ছাত্রদের।

বিয়ে করে পদ পাওয়াদের তালিকায় আরও আছেন কবির হোসেন, নানুপুরের রিয়াদ, হাসান আলী রিয়াদ, সাদেক আলী শুভ, আরিফ হোসেন, বোরহান, নাঈম উদ্দীন, আদিল চৌধুরী। তবে সহ-সভাপতি জাবের আল মাহমুদের নাকি তিন বছরের একটি বাচ্চাও রয়েছে। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পরই তিনি ফেসবুক থেকে সমস্ত ছবি মুছে ফেলেছেন বলে দাবি করেন তারই সঙ্গেই পদ পাওয়া একাধিক নেতা।

যোগ্য নেতৃত্ব থাকার পরও কেন এত অযোগ্য নেতায় ভরপুর উত্তরের কমিটি—এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে ফোন করা হয় উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসেন চৌধুরী তপুকে। তিনি এয়ারপোর্টে ব্যস্ত আছেন এবং পরে ফোন করবেন বলে ফোন রাখলেও আর সাড়া দেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নেতা জানান, এবার উত্তরের কমিটিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের একটি প্রভাব ছিল। চট্টগ্রামের একাধিক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের আবদার রাখতে অনেক অযোগ্য লোককে কমিটিতে আনা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় নেতারা জেনেশুনেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই এমন অযোগ্যদের পদে বসিয়েছেন বলে মনে করেন উত্তরের এই ছাত্রনেতা।

এদিকে এক ছাত্রনেতার বিষয়ে তথ্য প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক পদধারী নেতা। তিনি প্রতিবেদককে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে জানান, তার কর্মী বিবাহিত তিনি তা জানেন। কিন্তু তার কর্মী দীর্ঘদিন রাজনীতি করলেও পদ পাননি। তাই কর্মীর আবদার মেটাতে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নেতা বানিয়েছেন। যদিও এই প্রতিবেদনে ওই কর্মীর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

পদ পাওয়া এসব নেতার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে উত্তরের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের। তারপরও তারা কমিটির জন্য তাদের নাম সুপারিশ করেন। যদিও এখন তারা বেমালুম ভুলে গেছেন তাদের কর্মীরা বিবাহিত কি-না। বিবাহিতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে, সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবেন বলে আশার বাণী শোনান উত্তরের শীর্ষ নেতারা।

২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন। সম্মেলনস্থলে সংঘর্ষের কারণে সম্মেলন বাতিল করে কমিটি ঘোষণা ছাড়াই চট্টগ্রাম ছাড়েন তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ঘটনার পর একই বছরের ৫ মে তানভীর হোসেন তপুকে সভাপতি ও রেজাউল করিমকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

কিন্তু এক বছরের মধ্যে কমিটি করতে না পারলেও পদ পাওয়ার পর একাধিক কারণে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় এই কমিটিকে। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডের কমিটি অনুমোদন দেওয়ার জন্য টাকা লেনদেনের অভিযোগ ওঠে জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারির বিরুদ্ধে।

ডিজে/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm