ফুটপাত পেরিয়ে স্বপ্নের আকাশে: চট্টগ্রামে ঈদের আনন্দে সাজছে এক হাজার ‘নগরফুল’

চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ খ্যাত সিআরবিতে শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে ঈদের নতুন পোশাক হাতে উচ্ছ্বসিত শত শত শিশু। একসময় যাদের অনেকেই পরিচিত ছিল ‘পথশিশু’ বা ‘সুবিধাবঞ্চিত শিশু’ হিসেবে, এখন তারা পরিচিত ‘নগরফুল’ নামে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নগরফুল আয়োজিত ‘সবার আগে ঈদের সাজে সাজবে নগরফুল’ কর্মসূচিতে প্রায় এক হাজার শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ঈদের নতুন পোশাক, আর সেই উৎসবঘেরা পরিবেশেই ফুটে উঠছে ফুটপাত পেরিয়ে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার একের পর এক গল্প।

সেখানে দেখা মেলে আট বছর বয়সী সানজিদার। চট্টগ্রাম নগরের নির্মাণ শ্রমিক বাবার ও গৃহিণী মায়ের দুই সন্তানের মধ্যে ছোট সে। দুই বছর আগেও তার নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হতো ‘পথশিশু’ বা ‘সুবিধাবঞ্চিত শিশু’ পরিচয়। কিন্তু ছোট্ট সানজিদার চোখে তখনও ছিল বড় স্বপ্ন—একদিন সে পাইলট হবে। দারিদ্র্যের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন যেন ঝরে যাওয়ার আগেই হারিয়ে যেতে বসেছিল। ঠিক সেই সময় তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নগরফুল’।

সানজিদার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে তাকে নিয়ে আসা হয় সিআরবিতে নগরফুল পরিচালিত স্কুলে। এরপর থেকেই তার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘নগরফুল’ নামটি। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা, যাদের তারা ভালোবেসে ‘মালি’ বলে ডাকে, তাদের যত্ন ও ভালোবাসায় এখন সানজিদা এগিয়ে চলেছে পাইলট হওয়ার স্বপ্নের পথে।

সানজিদা জানায়, তার বড় ভাইও একসময় নগরফুলের অধীনে বড় হয়েছে। মালিদের পরিচর্যায় বেড়ে উঠে এখন সে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি দপ্তরে কাজ করছে। ভাইয়ের এই সাফল্যই তাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে।

‘ফুল’ থেকে ‘মালি’

সানজিদার মতোই বদলে গেছে আরও অনেক শিশুর জীবন। তাদের মধ্যে রয়েছে দুই বান্ধবী সাথি ও তুলি। একসময় তারাও ছিল নগরফুলের ‘ফুল’। আর এখন নিজেরাই হয়ে উঠেছে ‘মালি’।

সাথি ও তুলি জানান, অভাব-অনটনের মধ্যেই তাদের শৈশব কেটেছে। তাদের স্বপ্ন ছিল স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে কলেজে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষা অর্জন করা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অক্ষমতার কারণে সেই স্বপ্ন প্রায় থেমে যেতে বসেছিল। একসময় তাদের গল্প জানতে পারেন নগরফুলের স্বেচ্ছাসেবীরা। পরে তাদের নিয়ে আসা হয় সিআরবিতে পরিচালিত নগরফুলের স্কুলে। সেখান থেকে এসএসসি পাস করে এখন তারা কলেজে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি নিজেরাও এখন নগরফুলের মালি হিসেবে কাজ করছেন এবং নতুন প্রজন্মের আরও অনেক ‘ফুলকে’ যত্নে লালন করছেন।

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি

নগরফুল আয়োজিত এই কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় এক হাজার সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুর মাঝে ঈদের নতুন পোশাক বিতরণ করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায়।

কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে এমন মানবিক উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সামাজিক সংগঠনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষও যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে এসব শিশুর জীবনমান উন্নয়নে আরও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। নগরফুলের এই উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নগরফুলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান বায়েজিদ সুমন। তিনি বলেন, ঈদ আনন্দের উৎসব হলেও সমাজের অনেক শিশুই দারিদ্র্য ও অবহেলার কারণে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। নগরফুল শুরু থেকেই চেষ্টা করছে সেই শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে। গত ১১ বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও এক হাজার শিশুর হাতে ঈদের নতুন পোশাক তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটপাত থেকে উঠে এসে তাদের অনেক ‘নগরফুল’ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে বলেও জানান তিনি। সবার সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও অনেক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ (বিপিএম), ইউনিসেফের সাবেক ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সায়েদ মিল্কি, কোতোয়ালি থানার ওসি মো. আফতাব উদ্দিন, চসিকের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ, লায়ন ওসমান গনি এবং লায়ন শওকত ইসলামসহ অনেকে।

‘পথশিশু’ নয়, সম্ভাবনার ‘নগরফুল’

নগরফুলের স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ‘পথশিশু’ পরিচয় মুছে দিয়ে তাদের সম্ভাবনাময় ‘নগরফুল’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তারা নগরের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন। তাদের বিশ্বাস, সঠিক পরিচর্যা পেলে এই শিশুরাই একদিন দেশের মূল্যবান মানবসম্পদে পরিণত হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে চট্টগ্রামের সিআরবিতে পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করে ‘নগরফুল’। এরপর থেকে শিক্ষা, মানবিক সহায়তা ও বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নগরের অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জীবনে পরিবর্তনের আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি।

ksrm