কক্সবাজারের চকরিয়ার সন্তান আসহাদুল ইসলাম টিপু ঠাঁই করে নিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মর্যাদার মঞ্চ ফিফার তালিকায়। একসময় যাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছিল—‘রেফারিং করে কী হবে?’ সেই টিপুই এখনই যোগ্য উত্তর দিয়েছেন নিজের যোগ্যতা দিয়ে। গ্রামের মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা পর্যন্ত তাঁর যাত্রা এখন শুধুই ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সংগ্রাম, স্বপ্ন আর অধ্যবসায়ের এক অনন্য ইতিহাস।
শৈশব থেকেই খেলাধুলাই ছিল টিপুর জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ। ধুলোমাখা গ্রামের মাঠে ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন ও দৌড়ের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তার লড়াকু মানসিকতা। ২০০৫ সালে স্কুল ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় উপজেলা ও জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পান তিনি, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় বড় স্বপ্ন—খেলাধুলাই হবে জীবনের পরিচয়।
গ্রামের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে চকরিয়া থেকে চট্টগ্রামে আসার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। পরিবার ও বাস্তবতার চাপ সামলেও তিনি নিজেকে গড়ে তোলার লড়াই চালিয়ে যান। কলেজ জীবনে খেলাধুলাই তাঁকে বেশি টানত, বিশেষ করে ভলিবল। সেই ভলিবল খেলতে খেলতেই রেফারিংয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়, যা পরে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মেজো ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ২০১৩ সালে তৃতীয় শ্রেণির রেফারি হিসেবে যাত্রা শুরু করেন টিপু। শুরুটা সহজ ছিল না—ছিল অনিশ্চয়তা, থেমে যাওয়া আর আবার নতুন করে শুরু করার সংগ্রাম। ধাপে ধাপে তিনি এগিয়ে যান, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির রেফারি, ২০২১ সালে প্রথম শ্রেণির রেফারি এবং ২০২৩ সালে জাতীয় রেফারি হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। এরপর ২০২৪ সাল থেকে দেশের শীর্ষ লিগে নিয়মিত দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি।
অবশেষে ফিফা ফিটনেস টেস্টে উত্তীর্ণ হয়ে ২০২৬ সালে তিনি জায়গা করে নেন ফিফার মর্যাদাপূর্ণ তালিকায়। এর মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক যাত্রা। ৫ মে ভুটান বনাম ম্যাকাও আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিষেক করেন। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন কক্সবাজার জেলার প্রথম ফিফা সহকারী রেফারি।
তবে এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক বেদনা। একসময় বাবা-মা প্রশ্ন করেছিলেন—রেফারিং করে কী হবে?, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি দু’জনকেই হারান। জাতীয় রেফারি হওয়ার আগে হারান মাকে, আর ফিফা স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই হারান বাবাকে।
শিক্ষাজীবনেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে শারীরিক শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে তিনি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি অনলাইন স্পোর্টস ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত আছেন।
তারা পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিন ভাই রেফারি হিসেবে কাজ করতো। তবে বর্তমানে একজন সেই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, রেফারিং এমন একটি পেশা যেখানে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়, তবে একটি ভালো ম্যাচ শেষে পাওয়া সম্মানই সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।




