ফাইল খুললেই ঘুষ, স্বত্বহীন জমিতেও নামজারি, চট্টগ্রামে খতিয়ান-চক্রের আড়াল খুলল ভুক্তভোগী

ফাইলের ‘মূল্য’ ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে টাকার বিনিময়ে নামজারি ও একতরফা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. জহির রায়হানের বিরুদ্ধে। গত ১০ মে এই অনিয়মের অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী মো. ফারুক আহমেদ। অভিযোগে তহসিলদারের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে নামজারি ও মিথ্যা খতিয়ান তৈরির বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

নামজারিতে ঘুষের দাবি

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ৪১৮৮ নম্বর মামলায় ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. জহির রায়হান একটি একতরফা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। ১৭৪৩ নম্বর নামজারি খতিয়ানের প্রস্তাবিত ফরম দেখে প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে তিনি ভুক্তভোগী মো. ফারুক আহমেদের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি একতরফাভাবে প্রতিবেদন জমা দেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রস্তাবিত ফরমে ৮৮৭ নম্বর দাগে জমির পরিমাণ ১৩৫০ শতক থাকলেও তহসিলদার জহির রায়হান ১৭৪৩ নম্বর খতিয়ানে তা ২৬৫০ শতক দেখিয়ে সৃজন করেন। বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখের জন্য অনুরোধ করা হলেও তিনি তা আমলে নেননি।

মালিকানাহীন জমিতে নামজারি

তহসিলদার মো. জহির রায়হানের বিরুদ্ধে স্বত্বহীন ব্যক্তির নামেও নামজারি করে দেওয়ার গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে। ইছানগর মৌজার ২৩০ নম্বর খতিয়ানের মালিক মো. ইসমাইলের নামে মাত্র ৪১ দশমিক ৬২ শতক জমির হিস্যা ছিল। কিন্তু তহসিলদার তাকে সুবিধা দিতে মোসা. আলমাস খাতুনের নামে ১৯ শতক ও মোসা. লায়লা বেগমের নামে ৩০ শতক জমির নামজারি করিয়ে দেন। এতে মূল খতিয়ানের চেয়ে ৭ দশমিক ৩৮ শতক জমি অতিরিক্ত প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৫৪/২৫-২৬ নম্বর মামলার আদেশ অনুযায়ী ২৫-৪০৮৯ নম্বর খতিয়ানের ৭ শতাংশ জমি, যাতে মো. ইসমাইলের কোনো স্বত্ব ছিল না, সেটিও টাকার বিনিময়ে তার নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।

ফাইল খুললেই দিতে হয় টাকা

ভুক্তভোগী মো. ফারুক আহমেদের অভিযোগ, চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রতিটি নামজারি ফাইলের জন্য মো. জহির রায়হান সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন। অন্যদিকে বিবিধ মামলার জন্য তিনি সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে ১ লাখ বা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকেন। এ বিষয়ে মো. ফারুক আহমেদ বলেন, ‘আমি সঠিক তথ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় তিনি আমার বিরুদ্ধে একতরফা রিপোর্ট দিয়েছেন। যাদের জমিতে কোনো স্বত্ব নেই, তাদের কাছ থেকেও টাকা নিয়ে তিনি নামজারি করে দিয়েছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. জহির রায়হান বলেন, ‘কাজের চাপের কারণে ওইদিন বিষয়টি খেয়াল করতে পারিনি। যদিও অফিস সহকারী মো. শহীদ মূল ভলিউম যাচাই করে থাকেন। ভুলে ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমি বেশি নামজারি হয়ে গেছে। পরে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে খতিয়ানটি বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ঘুষের অভিযোগটি সত্য নয়।’ এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল আমিন হোসেন বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে পরে মন্তব্য জানানো হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে কর্ণফুলীতে।

সিপি

ksrm