পুলিশের পাহারায় থেকেও শিল্পপতির বাড়িতে দ্বিতীয় হামলা, সাজ্জাদের আড়ালে বড় প্রভাবশালীর ছায়া
১০ কোটির অংক নেমে এসেছিল ২ কোটিতে
সশস্ত্র পুলিশ প্রহরার মাঝেই সকালের আলো ফোটার পর এলোপাতাড়ি গুলি। নগরের চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসায় শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ছয়টার এই হামলা দুই মাস আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তবে এবার প্রশ্ন আরও গভীর। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ আলীর নাম সামনে এলেও চট্টগ্রামের ভেতরে বসে আড়ালে কলকাঠি নাড়ছে কারা? অনুসন্ধানে অন্তত একজন শীর্ষ বিএনপি নেতার ছায়ায় সাজ্জাদের হয়ে মধ্যস্থতায় মাঝারি পর্যায়ের এক নেতা ও সিএমপিতে কর্মরত এক সাবেক ওসির নাম আসছে।
সকালের গুলিতে কাঁপল চন্দনপুরা
নগরের চন্দনপুরা এলাকায় ওই বাসাটি গত ২ জানুয়ারির গুলির ঘটনার পর থেকেই পুলিশের সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল। তবু সকালবেলা অস্ত্রধারীরা বাড়ির পেছনের খালপাড় ঘেঁষে এসে এসএমজি, রাইফেল ও শটগান থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ৬ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি চালিয়ে তারা সরে পড়ে।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চারজন পুলিশ সদস্য সামনে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ পেছন দিক থেকে গুলি শুরু হলে তারা দ্বিতীয় তলায় উঠে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। সেখানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রসহ গানম্যানরাও ছিলেন। তবে দ্বিতীয় তলার গেট বন্ধ থাকায় ওপরে ওঠা সম্ভব হয়নি। হামলাকারীরা ছোট একটি গাড়িতে খালপাড় হয়ে এসে ধনিয়া পুলের দিকে গাড়ি রেখে অবস্থান নেয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার পর গাড়িটি রাহাত্তারপুল হয়ে পালিয়ে যায়।
বাসার সিকিউরিটি গার্ড সন্ত্রাসীদের দেখে সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়জন পুলিশ সদস্যকে জানান। পুলিশ সদস্যরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে দাবি করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই হামলাকারীরা এলাকা ছাড়ে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, চারজন অস্ত্রধারী প্রায় ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গুলি ছুঁড়ে চলে গেছে। বাড়ির সামনে পুলিশ থাকায় এবার চাকতাই খাল লাগোয়া পেছনের অংশ থেকে হামলা করা হয়েছে। তার ধারণা, চাঁদার কারণেই এ হামলা।
দুই মাসে দুই হামলা
স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা চাঁদা না পেয়ে এ হামলা চালিয়েছে। গত ২ জানুয়ারি একই বাসায় গুলি চালিয়ে জানালার কাচ ভাঙা হয়, দরজায় গুলির চিহ্ন পড়ে।
জানা গেছে, প্রথমে ১০ কোটি টাকা, পরে ৫ কোটি এবং সর্বশেষ ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে দুবাইয়ের বিভিন্ন নম্বর থেকে ‘সাজ্জাদ’ পরিচয়ে মুজিবুর রহমানের কাছে ফোন করে ১০ কোটি টাকা দাবি করা হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে আরেকটি বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। এক বার্তায় লেখা ছিল, ‘আপনাকে বারবার বলার পরও টাকা দিচ্ছেন না। আপনি কি মরতে চান?’
এর পর নিরাপত্তার জন্য ঢাকা থেকে অন্তত ছয়জন গানম্যান নিয়োগ করা হয়। তবু গত ২ জানুয়ারি ভোরে বাড়ির সামনে ও পেছনে গুলি চালানো হয়। এরপর থেকে বাসায় সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারা বসানো হয়।
২ জানুয়ারির পর সাজ্জাদের কয়েকটি নম্বর ব্লক করা হলে মুজিবুর রহমানের বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমানের নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো শুরু হয়। ‘ওয়েটিং ফর ইউ’, ‘স্টিল ওয়েটিং ফর ইউ’ এবং কয়েক দিন আগে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বার্তা পাঠানো হয়। ফোনেও হুমকি দেওয়া হয়।
দুই ঘটনাতেই কোনো মামলা হয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মামলা করে লাভ কী, পুলিশ উপস্থিত থাকতেই গুলি হয়েছে।’
সিসিটিভি ফুটেজ ও সন্দেহের দিক
পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে মুখোশধারী চারজনকে দেখা গেছে। একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। অন্যদের হাতে এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল ও শটগান। তারা একটি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যে হামলা চালিয়ে বায়েজিদ বোস্তামীর দিকে চলে যায়।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার দক্ষিণ হোসাইন কবির ভূঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, সাজ্জাদ আলীর অনুসারী রায়হান ও বোরহান জড়িত থাকতে পারে।
আড়ালে খেলছেন কারা
জানা গেছে, গত ২ জানুয়ারির ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের শীর্ষ পর্যায় থেকে মোস্তাফিজ ও মুজিবকে সন্ত্রাসীদের কোনো টাকা না দিতে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। এর মধ্যেই বড় সাজ্জাদের পক্ষে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের এক বিএনপি প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে আলোচনায় আসা এক নেতা এবং সিএমপির বায়েজিদ থানায় কর্মরত ছিলেন এমন এক সাবেক ওসি।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ইঙ্গিত মিলেছে, দুবাই থেকে বড় সাজ্জাদের চাঁদা দাবির নেপথ্যে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার হাত থাকতে পারে। মোস্তাফিজ-মুজিবের পরিবারের সদস্যদেরও ধারণা, বড় কোনো ব্যক্তি এসব ঘটনার পেছনে সক্রিয়।
এদিকে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, গত ২ জানুয়ারির হামলায় ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে এবং ড্রাইভারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। যতটুকু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, আজকের ঘটনাও বড় সাজ্জাদের কাজ। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে জানুয়ারির ঘটনায় গাড়ি জব্দ ও একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করেনি কেন, এ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২ জানুয়ারির ঘটনায় যাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে সাজ্জাদের অনুসারী ইমনের যোগাযোগ থাকলেও মুজিবের বাড়িতে গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। তাদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার দেখিয়ে দায় এড়ানো হয়েছে।
অসমর্থিত সূত্রে দাবি, স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির সঙ্গে সাজ্জাদের যোগাযোগ রয়েছে। পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। তবে আগের ঘটনার পর সড়কের সিসিটিভি ফুটেজ থাকার পরও মামলা না হওয়া ও তদন্তে গড়িমসি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
পুলিশের পরীক্ষা নিচ্ছেন বড় সাজ্জাদ
১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান হত্যার পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে পরিচিত হয়ে ওঠেন সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় তার নাম আসে। পরে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন। বর্তমানে ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় নাম থাকলেও বিদেশে বসে চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে পুলিশের দাবি।
গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি হত্যাকাণ্ডে তার অনুসারীদের নাম এসেছে। গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব যায় ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে। পুলিশের ভাষ্য, অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে এই বাহিনীতে। তাদের মধ্যে খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদের নাম রয়েছে। বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা দেন সাজ্জাদ।
সিপি




