পাহাড়প্রমাণ জালিয়াতি, অথচ ৪২ প্যাকেট ‘গোয়ালিনী’ আদালতে জমা দিয়েই দায় সারলো এসএ গ্রুপ

এবার এক মাসের সময় দিলেন আদালত

সারা দেশের বাজার থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ‘গোয়ালিনী ডেইলী ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার’ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ১৪ দিন পার হয়েছে। অথচ বিশাল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামভিত্তিক এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) আদালতে জমা দিয়েছে মাত্র ৪২ প্যাকেট গুঁড়ো দুধ। সংশ্লিষ্টদের মতে, যে প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০০ টন গুঁড়ো দুধ বাজারে থাকার কথা, সেখানে প্রথম দফায় মাত্র ৪২ প্যাকেট ভেজাল পণ্য জমা দেওয়ার ঘটনা নতুন করে বিস্ময় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভেজাল গুঁড়ো দুধ ধ্বংস

নিরাপদ খাদ্য আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথির আদালতে বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) এসএ গ্রুপের পক্ষ থেকে এই সামান্য পরিমাণ গুঁড়ো দুধ জমা দেওয়া হয়। এরপর আদালতের নির্দেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নগর ভবনের পেছনে এই ৪২ প্যাকেট মিল্ক পাউডার ধ্বংস করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসএ গ্রুপ বাজার থেকে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের বিপরীতে কেবল আংশিক কিছু পণ্য উপস্থাপন করেছে। আদালত বাকি সব ভেজাল পণ্য জমা দেওয়ার জন্য এসএ গ্রুপকে আরও এক মাস সময় বেঁধে দিয়েছে।

শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা

এর আগে গত ২৪ নভেম্বর জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ এমন নিম্নমানের গুঁড়া দুধ বাজারজাত করার দায়ে এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. শাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত। নিরাপদ খাদ্য আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি ‘গোয়ালিনী ডেইলী ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার’-এর মান সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে ওই আদেশ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এই গুঁড়ো দুধ মোড়কজাত ও বাজারজাত করে আসলেও পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র।

ল্যাব রিপোর্টে জালিয়াতির প্রমাণ

পণ্যের চকচকে মোড়কে বড় অক্ষরে ‘ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার’ লেখা থাকলেও ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ল্যাব রিপোর্ট অনুযায়ী, দুধে নির্ধারিত মানের ন্যূনতম ৪২ শতাংশ চর্বি থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আবার বিডিএস মান অনুযায়ী প্রোটিন ৩৪ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও গোয়ালিনীর এই দুধে মিলেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা নির্ধারিত মানের চার ভাগের এক ভাগ মাত্র। পরীক্ষাগারের ফলাফলে দেখা গেছে যে পণ্যটির কোনো উপাদানই সঠিক মানে নেই, যা ভোক্তাদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

স্বীকারোক্তি ও জরিমানা

এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. শাহাবুদ্দিন আলমকে মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়। গত ১০ ডিসেম্বর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি বাজার থেকে এই পণ্য তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পলাতক থাকার পর গত ১০ ডিসেম্বর আদালতে হাজির হয়ে মো. শাহাবুদ্দিন আলম অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে নেন। এরপর তিন লাখ টাকা জরিমানা পরিশোধের মাধ্যমে তিনি মামলা থেকে রেহাই পান। শুনানি শেষে আদালত বাজার থেকে সব গোয়ালিনী ডেইলী ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার প্রত্যাহার করে তা আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সন্দেহ থেকে ল্যাব টেস্ট

নিম্নমানের এই গুঁড়ো দুধ বিক্রির অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর কামরুল হাসান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তিনি ৬৫০ টাকা দিয়ে এক কেজি ওজনের এক প্যাকেট গোয়ালিনী ডেইলি ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠান। গত ২১ অক্টোবর পাওয়া প্রতিবেদনে পণ্যটি মানসম্মত নয় বলে প্রমাণিত হয়। এর প্রেক্ষিতে গত ৩ নভেম্বর আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।

এ বিষয়ে এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. শাহাবুদ্দিন আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, আদালতে ‘গোয়ালিনী ডেইলী ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার’ জমা দেওয়া এবং সেখানে ধ্বংস করার বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

সিপি

ksrm