অ্যাসাইকুডা/ পাসওয়ার্ড বেহাতের আতঙ্কে চট্টগ্রাম কাস্টমস

0

রাজস্ব বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন আমিনুল হক (ছদ্মনাম)। গত ২ বছর ধরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের বিভিন্ন শাখায় রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হয়েছেন। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে দায়িত্ব পালনকালীন কাস্টমসের বিশেষায়িত সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আতঙ্কে থাকার কথা জানান। নিজের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড কখন হ্যাকিংয়ের খপ্পরে পড়বে—এ নিয়ে সবসময়ই উদ্বিগ্ন থাকতেন তিনি—জানালেন ওই কর্মকর্তা।

আমিনুল হকের মতো চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে বিভিন্ন পদে কর্মরত অনেক কর্মকর্তাই পাসওয়ার্ড বেহাত (হ্যাকিং) হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন। অবসরে যাওয়া দুই কাস্টম কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে ২২টি কনসাইনমেন্টের ২৭ কন্টেইনার পণ্য খালাস, একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার নামে দুটি আইডি ব্যবহার করে জালিয়াতির অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে নিয়ে যাওয়ার একাধিক ঘটনায় এই আতঙ্ক আরও প্রকট হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো ফাইলে স্বাক্ষর দিতে হয়। ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে কাস্টমসের বিশেষায়িত সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যারে পণ্য চালানের তথ্য আপডেট করতে হয়। অনেক সময় জালিয়াতচক্র কৌশলে লগইনের সময় ইউজার আইডির পাসওয়ার্ড রপ্ত করে ফেলে কৌশলে—এমন সন্দেহ রাজস্ব কর্মকর্তাদের অনেকেরই। পরবর্তীতে ওই আইডি এবং পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য খালাস করার ঘটনা ঘটে।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অবসরে যাওয়া দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে ২৭ কন্টেইনার পণ্য খালাস করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত গড়ায়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই ঘটনায় একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয় যেখানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের ১৫ কর্মকর্তাকে এই জালিয়াতির ঘটনায় চিহ্নিত করা হয়েছে।

অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যার নেটওয়ার্কে ইউজার আইডির অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে আরও কয়েক দফায়। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বেনজীন আক্তারের বিরুদ্ধে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারে ইউজার আইডি অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে। নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমসের যে কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তার একটি আইডি ব্যবহারের বিধান থাকলেও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুটি আইডি ব্যবহারের প্রমাণ পায় কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। বিষয়টি অবহিত করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়।

কাস্টম কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বহুবার। একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে এরকম একটি জালিয়াতির চেষ্টাকালে গত ১ নভেম্বর পণ্যভর্তি দুই কন্টেইনার আটক করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের একজন রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজস্ব বিভাগ থেকে দুই বছর পর অবসরে যাবো। যেভাবে আইডি পাসওয়ার্ড হ্যাকিং কিংবা স্বাক্ষর জালিয়াতি করে পণ্য খালাস নেওয়ার ঘটনা ঘটছে সেখানে কবে নিজেই আইডি পাসওয়ার্ড হ্যাকিংয়ের শিকার হই তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে চাকরিজীবনের শেষ দিকে এসে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি অবসরে যাওয়ার পর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা প্রাপ্তিও অনিশ্চিত হয়ে যাবে।’

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যার নেটওয়ার্ক নিরাপদে ব্যবহারের বিষয়ে আরো অধিকতর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। হ্যাকারদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সিস্টেমের আরও আপগ্রেডেশন দরকার।

চট্টগ্রাম, খুলনা এবং কুমিল্লা অঞ্চলে কাস্টম এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাদের সংগঠন চকাএভের সভাপতি আমজাদ হাজারী বলেন, ‘চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে সফটওয়্যারে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটছে। এই চক্রটি অনেক বেশি শক্তিশালী। রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের আইডি পাসওয়ার্ড কৌশলে জেনে নিয়ে বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে নিয়ে যাচ্ছে।’

এসএস

Loading...
আরও পড়ুন