দুই বছর পর আবারও পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। আবাসিক ও অনাবাসিক উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে চার সদস্যের একটি কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়েছে। গ্রাহক ও পেশাজীবীদের মতামত যাচাই করে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
শনিবার (১ আগস্ট) চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির নবম সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।
সভায় উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষ্ণু কুমার দে-কে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে, বোর্ড সদস্য বেগম সৈয়দা জেরিন হোসেন এবং ছাত্র প্রতিনিধি রাসেল মিয়া। লালমনিরহাটের বাসিন্দা রাসেল মিয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, আগামী দুই মাস পর অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী সভার আগে এই কমিটি গ্রাহকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে। এরপর তাদের সুপারিশ বোর্ডে উপস্থাপন করা হবে।
কেন বাড়াতে চায় ওয়াসা
সভায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বোর্ডের অনুমোদনে বছরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত পানির দাম বাড়ানো যায়। এর বেশি বাড়াতে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। সেই বিধান অনুযায়ী রাজস্ব বিভাগ আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে গ্রাহক ও পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পরই বোর্ড এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সভায় জানানো হয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গভীর নলকূপের বদলে নদীর পানি শোধনের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পগুলোর কিস্তি পরিশোধের আর্থিক চাপও রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখতেই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আনা হয়েছে।
আগের উদ্যোগ, বর্তমান মূল্য
এর আগে গত ২০২৪ সালের এপ্রিলে এক দফায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা। তখন আবাসিক সংযোগে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১৮ টাকা থেকে ২৩ টাকা ৫০ পয়সা এবং অনাবাসিক সংযোগে ৩৭ টাকা থেকে ৫৫ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রস্তাব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের কথা থাকলেও গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তা আর কার্যকর হয়নি।
বর্তমানে আবাসিক সংযোগে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১৮ টাকা এবং অনাবাসিক সংযোগে ৩৭ টাকা।
এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ পানির দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন এক দফায় ৩৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। চট্টগ্রাম ওয়াসার মোট গ্রাহকসংযোগ ১ লাখ ৪ হাজার ৫১১টি। এর মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশই আবাসিক। ফলে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে গৃহস্থালি গ্রাহকদের ওপর।
চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ছিল ৫ টাকা ৪১ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ১৫ টাকা ৩২ পয়সা। ২০১৪ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ৬ টাকা ৯০ পয়সা ও ১৯ টাকা ৫৯ পয়সা হয়। ২০২০ সালে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য দাম নির্ধারণ করা হয় ১২ টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩০ টাকা ৩০ পয়সা। পরে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১৩ টাকা এবং ৩১ টাকা ৮২ পয়সা করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আবারও মূল্যবৃদ্ধি করে আবাসিকে ১৮ টাকা এবং অনাবাসিকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিবাদ জানিয়েছে ক্যাব
পানির দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে চট্টগ্রামের কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির দাবি, প্রশাসনিক অদক্ষতা, অনিয়ম এবং পানির অপচয় রোধ করা গেলে মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে না।
রোববার (২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ক্যাব জানায়, নগরীর প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় এখনও ওয়াসার পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়নি। অনেক এলাকায় গ্রাহকদের ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত ও লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বা ‘ভুতুড়ে’ বিলের অভিযোগও রয়েছে। এ অবস্থায় সেবার মান ও পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
ক্যাবের নেতারা আরও অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম বোর্ড সভায় অতীতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের পরিবর্তে গ্রাহকদের ওপর নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে পানির দাম বাড়ানো হলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
আইএমই/ডিজে




