পৃথিবীর এক নির্মম সত্য হলো—এখানে কেউ চিরস্থায়ী নয়। একদিন না একদিন, প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। ইতিহাসে কেউ অমর হয়নি, হবেও না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই—যদিও তোমরা শক্ত ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।’ (সূরা নিসা : ৭৮)
মৃত্যুর পরের জীবনকে পরকাল বলা হয়। এটি অন্তর্ভুক্ত করে—কবর, কিয়ামত, হাশর, আমলের হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নাম। মানুষের সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্য পরকালসহ গভীরভাবে যুক্ত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি কাজ ও কর্মফল পরকালের সাথেই সম্পর্কিত।
মৃত্যু: এক অনিবার্য সত্য
প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি আসে এবং পরকালের অনন্ত জীবন শুরু হয়। দুনিয়ার দুই ঠিকানা—জান্নাত ও জাহান্নাম।
যারা আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর আদেশ মেনে কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবনযাপন করে, তারাই জান্নাতি।
যারা তা অমান্য করে, তারাই জাহান্নামি। জাহান্নাম হলো পাপীদের শাস্তির স্থান ও দুঃখের কারাগার।
পরকালের চিন্তা মানুষের পার্থিব জীবনকে সুশৃঙ্খল করে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এজন্য পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ধর্মীয় দায়িত্ব ও পরকালীন জীবন সম্পর্কে বারংবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যেমন বলা হয়েছে, ‘আর আল্লাহ মানুষের জন্য দৃষ্টান্তগুলো পেশ করেন, যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা ইব্রাহিম : ২৫)
সুখ-শান্তি ও প্রকৃত সফলতা
প্রত্যেক মানুষ সুখ-শান্তি ও সফলতা চায়। কিন্তু অধিকাংশই কেবল পার্থিব আরাম-আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে সেটি মনে করে। তাই দেখা যায়, দুনিয়া অর্জনের পেছনেই সব পরিশ্রম। অথচ পরকালের জীবনই আসল এবং চিরস্থায়ী।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এই দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। নিশ্চয়ই আখেরাতের নিবাস হলো প্রকৃত জীবন যদি তারা জানত।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৪)
বুদ্ধিমান মানুষ সেই ব্যক্তি, যিনি অনন্ত জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে। তাদের কাছে দুনিয়া কেবল অস্থায়ী।
দুনিয়া: সফরের মতো
মুমিনের জন্য দুনিয়া চিরস্থায়ী আবাস নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার এই জীবন দিয়ে আমি কী করব? আমার এবং দুনিয়ার জীবনের তুলনা একজন যাত্রীর মতো, যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিল, তারপর ছেড়ে চলে গেল।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘দুনিয়ার জীবনে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন আগন্তুক বা পথচারী।’
কবর: পরকালের প্রথম ঘাঁটি
প্রতিটি মানুষকেই একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে কবরের কোলে আশ্রয় নিতে হবে। কবর হলো পরকালের প্রথম ঘাঁটি। আমাদের কেউ জানি না সেখানে অবস্থার কী হবে—কবর কি জান্নাতের খণ্ড বাগান হবে, নাকি জাহান্নামের গর্ত, যেখানে সাপ-বিচ্ছুর দংশনসহ অসহনীয় শাস্তি অপেক্ষা করবে।
দুনিয়া স্থায়ী নয়। সব আনন্দ, সুখ-শান্তি ও যশ ক্ষণিকের। পক্ষান্তরে, আখেরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই প্রকৃত জীবন শুধু আখেরাতের। মুমিনদের উচিত দুনিয়াতেও পরকালের পাথেয় ও পুঁজি সংগ্রহ করা।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং মৃত্যুর পরের জন্য নেকির পুঁজি সংগ্রহ করেছে, সে প্রকৃত বীর ও বুদ্ধিমান। আর যে প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে আল্লাহর ক্ষমার আশা করে, সে মূর্খ ও কাপুরুষ।’
জীবিকা ও দুনিয়ার প্রয়োজন
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য ও জীবিকার প্রয়োজন। ইসলাম বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ সমাপ্ত হলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো এবং আল্লাহকে স্মরণ করো যাতে সফল হও।’ (সূরা জুমা : ১০)
তবে দুনিয়া অর্জন করতে হবে যতটুকু পরকালের পাথেয় সংগ্রহে যথেষ্ট। কারণ, দুনিয়া হলো মানুষের প্রয়োজন পূরণের স্থান এবং পরকালের আবাদ ভূমি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র।’ অর্থাৎ, এখানে আখেরাতের ফসলের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
নবী-রাসুল ও আল্লাহপ্রিয় বান্দাদের দৃষ্টান্ত
নবী-রাসুলরা দুনিয়ায় সফল হলেও সর্বদা পরকালের দিকে নজর রাখতেন। তারা দুনিয়ায় সবকিছুই করেছিলেন, কিন্তু তা ছিল শুধু প্রয়োজনমাফিক। পরকাল ভুলে গিয়ে তারা দুনিয়ার পিছনে কখনও ছুটেননি।
সৌভাগ্যবান বান্দা হলো সেই ব্যক্তি, যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে পরকালের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে। যেমন পিঁপড়া গ্রীষ্মে শীতের জন্য খাবার মজুত রাখে, তেমনি মুমিন বান্দাও দুনিয়ায় থাকতেই আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে নেক আমল জমা করে রাখে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বস্তুত, তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবনই উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।’ (সূরা আলা : ১৬-১৭)
পরকালের জন্য প্রস্তুতি: এক অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে পড়ে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ থেকে উদাসীন হওয়া যাবে না। মানুষ আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল—দুনিয়া, কবর ও পরকালে সম্মান ও শান্তির জন্য। মহান আল্লাহর রহমত কোরআন মাজিদের মাধ্যমে হাসিল করা সম্ভব।
প্রতি বছর রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কিভাবে কোরআন দ্বারা দুনিয়া, কবর ও পরকালীন শান্তি ও কল্যাণ লাভ করা যায়। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের তৌফিক দান করুন।



