পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত পবিত্র কাবা শরিফ—যেখানে দাঁড়িয়ে এক মুমিনের হৃদয় কেঁপে ওঠে, চোখ ভিজে যায় অশ্রুতে। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মহান আল্লাহতায়ালার মনোনীত এই ঘর হয়ে উঠেছে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মিলনস্থল, যেখানে প্রথম দৃষ্টিতেই উচ্চারিত হয় গভীর আবেগময় দোয়া।
বাইতুল্লাহকে আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য প্রথম ঘর হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, মক্কায় অবস্থিত এই ঘর সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েত ও বরকতের উৎস। ইসলামের রাজধানী হিসেবে মক্কার খ্যাতির কেন্দ্রবিন্দু এই কাবা শরিফ, যা আল্লাহর ইবাদতের জন্য পৃথিবীর প্রথম নির্মিত ঘর।
ইতিহাসে জানা যায়, হজরত আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমনের আগেই ফেরেশতাদের মাধ্যমে কাবার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর যুগে এটি প্রথম কিবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়। হজরত নুহ (আ.)-এর আমলের মহাপ্লাবনের সময় এই ঘর আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং হাজরে আসওয়াদ সংরক্ষিত হয়। পরে হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুনরায় কাবা নির্মাণ করেন। বিভিন্ন যুগে আরব গোত্র ও উমাইয়া খেলাফতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এটি সংস্কার করেন, যার আদলেই আজকের কাবা শরিফ বিদ্যমান।
প্রথম দর্শনের দোয়া ও সুন্নাত
কাবা শরিফের প্রথম দর্শন একজন মুমিনের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। এই সময় যে দোয়া পড়া হয়, তা রাসুল (সা.)-এর সুন্নাত হিসেবে বর্ণিত। উচ্চারণ করা হয়, ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম, ওয়া মিনকাস সালামু, ফাহাইয়িনা রাব্বানা বিসসালাম।’ এর অর্থ, হে আল্লাহ, তুমিই শান্তি, তোমার পক্ষ থেকেই শান্তি আসে, অতএব আমাদের শান্তির সঙ্গে জীবিত রাখুন।
তাবেঈ মাকহুল (রহ.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) কাবা দেখে আরও একটি দীর্ঘ দোয়া পড়তেন, যাতে কাবার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং হজ ও ওমরা আদায়কারীদের সম্মান বৃদ্ধির প্রার্থনা করা হয়েছে। এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শান্তি, মর্যাদা ও কল্যাণ কামনা করা হয়।
কাবা শরিফের পূর্ণ দৃশ্য যখন হাজরে আসওয়াদের সামনে থেকে চোখে ভেসে ওঠে, তখন এক অদ্ভুত আবেগে হৃদয় ভরে যায়। এই মুহূর্তে লাখো কোটি মুমিনের মতো দোয়া পড়া সুন্নাত হিসেবে বিবেচিত। বলা হয়, এই দোয়া পড়লে আল্লাহ বান্দার অন্তরে শান্তি দান করেন এবং কাবার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
তাওয়াফের সময় দোয়া ও আমল
তাওয়াফের সময় নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক দোয়া নেই। তবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদের সামনে পৌঁছালে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং ইশারা করতেন। রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত যাওয়ার সময় তিনি কোরআনে বর্ণিত দোয়া পাঠ করতেন, ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাহ ওয়া কিনা আযাবান-নার।’ যার অর্থ, হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে সায়েব (রা.) জানিয়েছেন, তিনি রাসুল (সা.)-কে কাবার দুই রুকনের মাঝখানে এই দোয়া পড়তে শুনেছেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, নবিজি প্রায়ই এই দোয়া করতেন।
দোয়ার গুরুত্ব ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
কাবা শরিফ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের স্পন্দন। এই ঘর দেখার সৌভাগ্য একজন মুমিনের জন্য জীবনের বড় অর্জন। এই সময় আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে দোয়া করা, তাঁর সুন্দর নামসমূহের মাধ্যমে প্রার্থনা করা এবং সর্বদা তাঁকে স্মরণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, তাই তাঁকে সেই নামেই ডাকা উচিত। তাওয়াফের সময় যেকোনো জিকির, কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া বা অর্থবোধক প্রার্থনা করা যায়।
ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত আছে, কাবা শরিফের প্রথম দর্শনে ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শান্তি, জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় দোয়া করার নির্দেশনা রয়েছে।
কাবা শরিফের প্রথম দর্শন এক মুমিনের জীবনে এমন এক মুহূর্ত, যেখানে স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে এবং অন্তরে নেমে আসে গভীর প্রশান্তি। এই মুহূর্তে দোয়া করা, আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তাঁর রহমতের অংশীদার হওয়ার প্রত্যাশাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট




