পতেঙ্গায় খাবার পানির হাহাকার, ৩০ বছরেও পৌঁছায়নি ওয়াসার লাইন

চড়া দামে কিনতে হয় ড্রাম ও জারভর্তি পানি

‘ভোরে উঠে অফিসে যাওয়ার তাড়া, আবার সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রান্নাবান্নার তাড়া। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর আর কর্মব্যস্ততার মধ্যে পানি ফুটানো ও ঠাণ্ডা করার পেছনে ব্যয় করার মতো সময়ই থাকে না। তাই সময় বাঁচাতে, নিরাপদ-অনিরাপদ না ভেবে, ওয়াসার ড্রামভর্তি পানি কিনে রান্নার কাজে ব্যবহার করি এবং পান করি। এছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ডাক্তারের দোকানে পাওয়া যায়, তা কখনও জানতাম না।’

কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গার চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা গার্মেন্টসকর্মী লায়লা আক্তার। তার মতো এখানকার হাজারো গার্মেন্টসকর্মীর দৈনন্দিন জীবন চলে এভাবেই।

পতেঙ্গার ৪০ এবং ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ গত ৩০ বছরেও ওয়াসার পানির কোনো সংযোগ জোটেনি এলাকাবাসীর কপালে। এছাড়া এলাকায় পর্যাপ্ত পুকুর, নলকূপ বা অন্য কোনো উৎস না থাকায় রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজেও রয়েছে ব্যবহারযোগ্য পানির তীব্র সংকট।

এই ওয়ার্ড দুটি বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী হওয়ায় এখানকার পানি লবণাক্ত। এজন্য এসব পানি যেমন খাবার যোগ্য নয় তেমনি রান্নাবান্নাসহ কাপড় ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা যায় না। তাই ড্রাম বা জারভর্তি ওয়াসার পানি কোনোরকম বিশুদ্ধ না করেই ব্যবহার করেন এই এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষ।

আর এই কেনা পানি বিশুদ্ধ না করে খাওয়ায় এলাকার বাসিন্দারা প্রায় সময় ডায়রিয়া, আমাশয়, রক্ত আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। এছাড়া লবণাক্ত এই পানি ব্যবহারে ত্বক ও চুলের ক্ষতিসহ শরীরে নানান চর্মরোগ দেখা দেয় অনেকের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য নিরাপদ পদ্ধতি হতে পারে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের ব্যবহার। বাজারের যে কোনো ওষুধের দোকানে বিভিন্ন কোম্পানির সাশ্রয়ী দামে এই ট্যাবলেট পাওয়া যায়। প্রতি তিন লিটার পানিতে একটি ট্যাবলেট মেশালে, এক ঘণ্টার মধ্যে তা বিশুদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণে এই ট্যাবলেট ব্যবহার করলে নানা রোগ-জীবাণু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পাশের ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের বিভিন্ন ভবন মালিক থেকে জারভর্তি করে পানি কিনে ভ্যানে করে পতেঙ্গা এলাকায় বিক্রি করেন অনেকে। ফুটপাতের টঙ দোকান থেকে শুরু করে বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয় এসব জারভর্তি পানি।

তবে জারভর্তি এসব পানি বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করেন না পতেঙ্গা এলাকার প্রায় বাসিন্দা। পানি বিশুদ্ধ করার বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট আছে, সে কথাটায় জানেন না অনেকে।

মূলত পতেঙ্গা এলাকার বেশিরভাগ নিম্নআয়ের মানুষের বসবাস। পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য বিভিন্ন দামের ফিল্টার কেনাও অনেকের জন্য দুরূহ। শুধুমাত্র বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বর্ষাকালে কিছুটা বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারে তারা।

পতেঙ্গা এলাকার পানি বিক্রেতা মো. রফিক বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল-বিকাল দু’বেলা ইপিজেড, বন্দরটিলা, নেভী হাসপাতাল গেট, ঈঁসা খান গেট, সিমেন্ট ক্রসিং, নারিকেল তলা স্টিলমিলস, জিএম গেট এলাকা থেকে ওয়াসার পানি কিনে পতেঙ্গা এলাকায় বিক্রি করি। ২০ লিটারের প্রতিজার পানি ৫ টাকায় কিনে ২০ টাকা বিক্রি করি। পতেঙ্গা এলাকায় আমার মতো এই রকম অনেক পানি বিক্রেতা আছে।’

তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে ওয়াসার পানির লাইনে লিক হলে, পানিতে ময়লা আসে। তবে এসব আমরা দেখি না, পানি কিনে বিক্রি করায় আমাদের কাজ।’

পানির উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পতেঙ্গার আশপাশের ওয়ার্ডের কিছু ভবনের মালিক বছরের পর বছর ধরে ওয়াসার পানি বিক্রি করে আসছেন। আমরা তাদের থেকে এসব পানি কিনে এনে পতেঙ্গায় বিক্রি করি।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পানি বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি ও ট্যাবলেট সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রচারণা নেই পতেঙ্গায়।

পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট ব্যবহার করেন কি-না জানতে চাইলে কিছুটা অবাক হন পতেঙ্গার পূর্ব কাটগড় এলাকার বাসিন্দা লায়লা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি জানতামই না ট্যাবলেট ব্যবহার করে পানি বিশুদ্ধ করা যায়। আগে জানলে পানি বিশুদ্ধ করতে এই ট্যাবলেট ব্যবহার করতাম, তাতে পরিবারের সদস্যদের অসুখও কম হতো। পানি ফুটিয়ে পান করলে আমার কেমন যেন একটা গন্ধ লাগে। তাই এতদিন না ফুটিয়েই ওয়াসার কেনা পানি পান করতাম।’

একই সুরে কথা বলেন পতেঙ্গার জেলেপাড়ার কার্তিক জলদাস। তিনি বলেন, ‘পানি ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করার ঝামেলায় না গিয়ে ওয়াসার কেনা পানি সরাসরি পান করি। কম দামে বাজারে যে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাওয়া যায়, তা আগে জানতাম না। এটা নিয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো প্রচার-প্রচারণাও দেখিনি কখনও।’

পতেঙ্গা মুসলিমাবাদ এলাকার পল্লী চিকিৎসক বিপ্লব মল্লিক বলেন, ‘পতেঙ্গার সবচেয়ে বড় ও অন্যতম সমস্যা বিশুদ্ধ পানির অভাব। পানির কারণে প্রতিনিয়ত শিশু থেকে বৃদ্ধরা এলার্জি, হাম, ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস রোগে ভুগছে। গত এক মাসে প্রায় এক শতাধিক ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুকে আমি মা ও শিশু হাসপাতালের পাঠিয়েছি। প্রায় ১২০ জন বয়স্ক ডায়রিয়া রোগীকে ফৌজদারহাটের হাসপাতালে পাঠিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘পানির প্রভাবে মাথার চুল ও ত্বকের ক্ষতির পাশাপাশি কাপড়ের রঙ থাকে না। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের প্রতি মানুষের আস্থা কম। ছোট এই ট্যাবলেট দিয়ে সত্যিই কি পানি বিশুদ্ধ হয়—এমন ধারণা তাদের।’

নগরীর অন্তত ১৫ ওষুধ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পানি বিশুদ্ধ করতে ক্লোরিন ট্যাবলেট, হ্যালোজেন ট্যাবলেট, অ্যাকোয়াসিওর ট্যাবলেট পাওয়া যায় বাজারে। ১৫ বছর আগেও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের চাহিদা ও বিক্রি ছিল ব্যাপক। তবে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ জানেন না, ফার্মেসিতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাওয়া যায়।’

‘প্রাণের পতেঙ্গা সামাজিক সংগঠন’র সাংগঠনিক সম্পাদক রিটন বড়ুয়া বাবু চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘পতেঙ্গাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, বিশুদ্ধ পানি। পতেঙ্গায় ওয়াসার লাইন না আসা পর্যন্ত পানি পান ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যদি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, পানি ফুটিয়ে পান করাসহ বিশুদ্ধকরণে মানুষের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়, তবে অনেক মানুষ রোগ থেকে রক্ষা পাবে।’

বন্দর-ইপিজেড-পতেঙ্গা করোনা হাসপাতালের প্রধান উদ্যোক্তা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হোসেন আহম্মদ বলেন, ‘বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষের শরীরে জটিল রোগ বাসা বাঁধে। এর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’, টাইফয়েড, ডায়রিয়া রয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে আমি মনে করি জীবাণু ধ্বংস করতে হলে, পানি ফুটিয়ে পান করা উচিত।’

এই বিষয়ে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সালেহ আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘পতেঙ্গায় ওয়াসার লাইন ও বিশুদ্ধ পানির জন্য আমি সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সময় থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। আগামীতে ওয়াসার সঙ্গে বৈঠকে বসলে আমি সেখানেও বিশুদ্ধ পানির জন্য দাবি জানাবো। এছাড়া অনেক মানুষ জানেই না, বাজারে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাওয়া যায়।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!