পণ্য খালাসে জালিয়াতি, সিএন্ডএফ এজেন্ট মিজানের জামিন বাতিল

0

রাষ্ট্র ও দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ হাজার বিল অব এন্ট্রি জালিয়াতির অভিযোগে চট্টগ্রামের সিএন্ডএফ এজেন্ট মিজানুর রহমান চাকলাদারের (দীপু) জামিন বাতিল করে দুই সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পনের আদেশ দিয়েছে আদালত। রোববার (২৭ অক্টোবর) শুনানি শেষে চেম্বার জজের জামিন বাতিল ও ২ সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের আদেশ আপিল বিভাগেও বহাল রেখেছেন।
জানা গেছে, গত ২ বছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সাবেক ২ কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার ৭৭৭টি চালান অবৈধভাবে খালাস করা হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে।
শুল্ক ফাঁকি ও চোরাকারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রামের সিএন্ডএফ এজেন্ট মিজানুর রহমান চাকলাদারকে (দীপু) আসামি করে গত ১৬ জানুয়ারি ঢাকার রমনা থানায় মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এই মামলায় সেদিনই মিজানুর রহমান চাকলাদারকে গ্রেপ্তার করে শুল্ক গোয়েন্দারা।

রোববার (২৭ অক্টোবর) রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও দুদকের পক্ষে আইনজীবী মো. খুরশিদ আলম খান।

২৩ জানুয়ারি মামলাটি সিআইডির কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে জামিন দেন ঢাকা মহানগর হাকিম মোরশেদ আল মামুন ভুঁইয়া। এই জামিন বাতিল চেয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবেদন করে বাদিপক্ষ।

আদালত গত ২৫ জুন তার জামিন বাতিল করে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেয়। কিন্তু মিজানুর রহমান ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পন না করে দায়রা জজ আদালতের আদেশ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। হাইকোর্টে এই আবেদন উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ হবার পর তিনি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পন করেন গত ১০ জুলাই।

এরপর তিনি হাইকোর্ট থেকে গত ১৪ জুলাই জামিন নেন। এই জামিন আদেশের সময় হাইকোর্ট দুদককেও রুলের জবাব দিতে বলেছিলেন, সেই কারণে রাষ্ট্র ও দুদক আবেদন করে।

এরপর গত ২৭ আগস্ট তার জামিন বাতিল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত জামিন বাতিল করে তাকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেন।

মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। আসামি চেম্বার জজের আদেশ মোতাবেক নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘জাল জালিয়াতি করে যারা অন্যায় করবে তাদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম কাস্টমস সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা দায়ের করা হবে। আইনের আওতায় আসতে হবে।’

সিএন্ডএফ এজেন্ট মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
গত বছরের জুনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কয়েকটি কনটেইনারে পণ্য আমদানি করে ঢাকার জারা এন্টারপ্রাইজ। সন্দেহজনক হলে পণ্য হওয়ায় খালাস না করতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজকে নির্দেশ দেয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ৪ মাস পর কায়িক পরীক্ষা করতে গিয়ে শুল্ক গোয়েন্দারা দেখেন চালানটি খালাস হয়ে গেছে। মুহিবুল ইসলাম নামে চট্টগ্রাম কাস্টমসের এক কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে চালানটি খালাস করা হয়। যদিও এ কর্মকর্তা ৩ বছর আগেই অবসরে গেছেন।

শুধু জারা এন্টারপ্রাইজ নয়, গত দুই বছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সাবেক দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার ৭৭৭টি চালান অবৈধভাবে খালাস করা হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে। এতে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা ও কাস্টমসের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে এ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন তারা।

এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল রাতে রাজধানীর রমনা থানায় এমআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও চাকলাদার সার্ভিস নামে দুটি সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। মামলার পরপরই কাকরাইল থেকে এমআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান চাকলাদারকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে সংস্থাটি।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার বলেন, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের মাধ্যমে পণ্য খালাস করতে কাস্টম হাউজের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দেয়া হয়। একজনের আইডি ও পাসওয়ার্ড অন্যজনের ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। কোনো কর্মকর্তা কোনো কাস্টম হাউজ থেকে বদলি হলে বা বিদায় নিলে সংশ্লিষ্ট ইউজার আইডি প্রোগ্রামার কর্তৃক বন্ধ করা হয়। ফলে বিদায় নেয়ার পর ওই ইউজার আইডি থেকে পণ্য খালাসের কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের কাজ করে আসছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কিছু কর্মকর্তা।

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাসের বেশকিছু অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে কাস্টম হাউজের সাবেক দুই কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে ৩ হাজার ৭৭৭টি চালান অবৈধভাবে খালাসের প্রমাণ পান শুল্ক গোয়েন্দারা। তারা বলছেন, এ প্রক্রিয়ায় উচ্চ শুল্কের পণ্যে ন্যূনতম শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ পণ্য আমদানি করা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দার তদন্ত অনুযায়ী, ঢাকার গুলশান এলাকার জারা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি করছে বলে খবর পায় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির একটি চালান খালাস না করতে নির্দেশ দেয় শুল্ক গোয়েন্দার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়। শুল্ক জালিয়াতির সংবাদ থাকায় ২৫ জুন চালানটি স্থগিত করতে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইসি) কাস্টমসকে নির্দেশ দেয়। এরপর চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে শুল্ক গোয়েন্দার নামের বিপরীতে পণ্য চালানটির বিল অব এন্ট্রি লক করে দেয়। পরবর্তী সময়ে ৫ সেপ্টেম্বর চালানটির কায়িক পরীক্ষা শেষ করে খালাস করতে সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টকে চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা। তবে সিএন্ডএফ এজেন্ট সাড়া না দেয়ায় অনুসন্ধানে নামে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জারা এন্টারপ্রাইজের চালানটি বিশেষ কায়দায় খালাস হয়ে গেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টা ৫৮ মিনিটে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে রাজস্ব কর্মকর্তা মুহিবুল ইসলামের আইডি ব্যবহার করে চালানটি আনলক করা হয়। পরে বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে এক্সিট নোট ইস্যু করে চালানটি খালাস নেয়া হয়, যা কাস্টম হাউজ বা শুল্ক গোয়েন্দা জানে না। চালান খালাস হওয়ার পর ২৭ সেপ্টেম্বর একই আইডি ব্যবহার করে সিস্টেমে চালানটি আবার লক করে দেয়া হয়। এভাবে ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুহিবুল ইসলামের আইডি থেকে ১১৬টি চালান খালাস করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। যদিও মুহিবুল ইসলাম অনুসন্ধানাধীন সময়ের ৩ বছর আগে ২০১৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।

মুহিবুল ইসলামের মতোই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে ফজলুল হক নামের আরেকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে ৩ হাজার ৬৬১টি চালান অবৈধভাবে খালাসের প্রমাণ পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ফজলুল হক ২০১৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে বদলি হন। তিন বছর ধরে তিনি ঢাকায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তার আইডি থেকে এসব চালান খালাসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মুহিবুল ইসলাম ও ফজলুল হকের মতো এমন আরো আইডি ব্যবহার করে কাস্টম হাউজ থেকে অবৈধভাবে পণ্য খালাস হচ্ছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

এএস/এসএস

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন