পটিয়ার কৃষি-বিপর্যয়: ৫১২ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে

চোখের সামনে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কৃষিখাতে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনজীবনের দুর্ভোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষকের জীবিকায়। কোমরসমান পানিতে ডুবে আছে ধান, সবজি ও আমনের বীজতলা। কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম, ধারদেনার মাধ্যমে করা বিনিয়োগ ও আগামী দিনের স্বপ্ন—সবই যেন ভেসে গেছে বানের জলে।

পটিয়ার কৃষি-বিপর্যয়: ৫১২ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে 1
পটিয়ায় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষি জমি

পটিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উপজেলার ১০০ হেক্টর আউশ ধান, ৩২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৩৮০ হেক্টর সবজি আবাদসহ মোট ৫১২ হেক্টর কৃষিজমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি বিভাগের আশঙ্কা, পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

সরেজমিন উপজেলার কচুয়াই, ধলঘাট, কেলিশহর, খরনা, কুসুমপুরা, বড়লিয়া, জঙ্গলখাইন, হাবিলাসদ্বীপ ও কোলাগাঁও ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও সবজির মাচা ডুবে আছে, কোথাও আবার আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে নিজেদের ফসল ডুবে যেতে দেখছেন কৃষকেরা; করার মতো কিছুই নেই।

কচুয়াই পাহাড়ি এলাকার কৃষক আবদুল জব্বার বলেন, গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে আমার তিন একর জমির কাকরোল, চিচিঙ্গা, পেঁপে, বেগুন, করলা, সিম ও আদার ক্ষেত একেবারে শেষ হয়ে গেছে। আগের বর্ষায় তেমন ক্ষতি না হলেও এবার চোখের সামনেই ডুবে গেল সবকিছু। ধারদেনা করে চাষ করেছি, এখন সেই টাকা কীভাবে শোধ করব জানি না।

জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, আমনের বীজতলা তৈরিতে অনেক টাকা খরচ করেছি। এখন সব পানির নিচে। পানি আরও কয়েক দিন থাকলে বীজতলা আর রক্ষা হবে না। নতুন করে বীজ কিনে চাষ করার মতো সামর্থ্য আমার নেই।

কেলিশহর এলাকার সবজি চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, আগাম সবজি চাষ করেছিলাম ভালো দাম পাব বলে। কিন্তু বাজারে নেওয়ার আগেই সব পানিতে তলিয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব, সেটাই বুঝতে পারছি না।

পটিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, এখনও অনেক এলাকায় পানি জমে আছে। তাই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ১০০ হেক্টর আউশ, ৩২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৩৮০ হেক্টর সবজি আবাদি জমি নিমজ্জিত হয়েছে। পানি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে বিস্তারিত জরিপ করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলছেন, পুনর্বাসন ছাড়া তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করলেই চলবে না বরং দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রমও শুরু করতে হবে। বিনামূল্যে আমনের বীজ, সবজির বীজ, সার, কৃষি প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা না হলে অনেক কৃষকের পক্ষেই নতুন করে চাষাবাদ শুরু করা সম্ভব হবে না।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তাদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এনএইচ

ksrm