পটিয়ায় এসএসসিতে প্রতি ১০০ জনে ফেল ৪৫ জন

চট্টগ্রামের পটিয়ায় গত বছর যেখানে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ পাস করেছিল, এবার সেখানে তা ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ১০০ জনে প্রায় ৪৫ জনই ফেল করেছে। শুধু পাসের হারেই ধস নয়, এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২০১ জন।

পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর উপজেলার ৪৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫ হাজার ৭৪৮ জন। পাস করেছে মাত্র ৩ হাজার ১৭৯ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ গত বছর ৪২টি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পয়েন্ট। সহজ হিসাব বলছে, এবার প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

এদিকে পাসের হারের সঙ্গে জিপিএ-৫-এর চিত্রও উদ্বেগজনক। গত বছর পটিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪১০ জন। এবার পেয়েছে মাত্র ২০৯ জন। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ২০১টি। এমনকি পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই সূচকেই একসঙ্গে বড় পতন হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে কয়েক মাসের প্রস্তুতি দিয়ে গণিত ও ইংরেজির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা তৈরি করতে হবে।

পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) দিপন কান্তি দে বলেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পটিয়া উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিষয়ভিত্তিক ফলাফলের তারতম্য, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তার অভাব এর অন্যতম কারণ হতে পারে। এছাড়াও প্রশ্নপত্রের কাঠামো ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে শিখনঘাটতি নিরসন, রেমিডিয়াল কার্যক্রম, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক মেন্টরিং ও একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অপরদিকে পটিয়ার ফলাফল বিপর্যয় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেও পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই ক্ষেত্রেই বড় পতন হয়েছে। চলতি বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট।

এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। গত বছর পেয়েছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন। বোর্ডে এবার ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন।

মেয়েরা এগিয়ে বোর্ডের ফলাফলে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ২৭৫ জন, ছাত্র ৪ হাজার ১২৩ জন।

পটিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে চিটাগাং আইডিয়াল হাই স্কুল। ১০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৬ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৩ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। দ্বিতীয় গৈড়লা খরনখাইন প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয় ৬২ জনের মধ্যে ৫৪ জন পাস, হার ৮৭ দশমিক ১০ শতাংশ। তৃতীয় আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ২৪৮ জনের মধ্যে ২০৪ জন পাস, হার ৮২ দশমিক ২৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫ জন।

চতুর্থ মনসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ পাসের হার ৮০ দশমিক ১৮ শতাংশ। পঞ্চম মোজাফরাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৮০ শতাংশ। ষষ্ঠ আরফা করিম উচ্চ বিদ্যালয় ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সপ্তম জঙ্গলখাইন উচ্চ বিদ্যালয় ৭৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। অষ্টম এস আলম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। নবম পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ৭২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দশম মুকুট নাইট উচ্চ বিদ্যালয় ৭১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

তবে এবারের ফলাফলে পাসের হারে শীর্ষে না থাকলেও জিপিএ-৫ এর হিসাবে এবারও উপজেলায় সেরা আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ২৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০৪ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৫ জন। দ্বিতীয় পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় জিপিএ-৫ ২৪ জন। তৃতীয় এস আলম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ জিপিএ-৫ ২২ জন।

এবার উপজেলার ২৩টি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮৬৫ জন। পাস করেছে ৬২৯ জন। পাসের হার ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। দাখিলে সেরা হয়েছে মেহেরআটি হযরত নুরুদ্দীন শাহ দাখিল মাদ্রাসা। ৩৫ জনের সবাই পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। দ্বিতীয় নলান্দা গাউসিয়া বদরিয়া দাখিল মাদ্রাসা পাসের হার ৯৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তৃতীয় দক্ষিণ আশিয়া গাউছিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা পাসের হার ৯০ শতাংশ।

পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় পটিয়া থেকে ৩৫৩ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ১৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ৪১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষাতেও এবার ফলাফলে বড় পতন ঘটেছে।

অপেক্ষাকৃত খারাপ ফলাফলের দিকে পটিয়ার ৩ বিদ্যালয় রয়েছে তাদের মধ্যে- শাহ আমির উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেন ৬৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ১৩ জন, পাশের হার ১৯.৪০ শতাংশ, বাথুয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৫৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৫ জন, পাশের হার ২৫.৮৬ শতাংশ ও হাইদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ৫৩ জন! পাশের হার ২৭.৭৫ শতাংশ। তবে এ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের কোন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাইনি।

পটিয়ার এক এসএসসি পরীক্ষার্থী তানজিম হোসেন বলেন, গণিত ও ইংরেজিতে নিয়মিত অনুশীলন না করলে শেষ মুহূর্তে ভালো করা কঠিন। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার কয়েক মাস আগে থেকে সিরিয়াস হয়েছে। আগে থেকে নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া হলে প্রস্তুতি আরও ভালো হতো।

আরেক শিক্ষার্থী তানিয়া আকতার বলেন, ক্লাসে পড়ানো হলেও অনেক সময় না বোঝা বিষয়গুলো আলাদাভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ কম থাকে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলে ফল আরও ভালো হতে পারত।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ প্রফেসর আবু জাফর চৌধুরী বলেন, অন্যান্য বারের তুলনায় এবার ফলাফল বিপর্যয় বেশি হয়েছে। পটিয়ায় দেখলাম কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।,পর্যাপ্ত বেতন প্রদান ছাড়া মেধাসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে না। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিরপেক্ষ হতে হবে, গভর্নিং বডি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবমুক্ত হতে হবে, উপযুক্ত গভর্নিং বডি থাকতে হবে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় মানসম্মত শিক্ষা ও প্রত্যাশিত ফল আশা করা যায়না।

এবার পটিয়ায় ৯টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ৬ হাজার ৮২৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে এসএসসি ৫ হাজার ৬৮৫ জন, দাখিল ৮৩৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৩০৬ জন।

ডিজে

ksrm