পটিয়ায় উন্নয়নের ৩ দরপত্র আগের তিন প্রতিষ্ঠানের হাতেই, ঠিকাদারদের বিক্ষোভ

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার উন্নয়ন কাজের তিনটি ই-জিপি টেন্ডার আবারও একই তিন প্রতিষ্ঠানের হাতে গিয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় নিবন্ধিত ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

টেন্ডারের ফল প্রকাশের পর সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যায় পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন অংশগ্রহণকারী ঠিকাদাররা। পরে তারা তিনটি টেন্ডারের কার্যাদেশ বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের দাবি তোলেন।

স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, জাতীয় ই-জিপি পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হলেও পটিয়া পৌরসভার একাধিক টেন্ডারে বছরের পর বছর ঘুরেফিরে একই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে আসছে। এতে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে হতাশা, অনাস্থা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক দরদাতা অংশ নেওয়ার পরও বারবার একই প্রতিষ্ঠানের হাতে কাজ চলে যাওয়া স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে।

পটিয়া পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ই-টেন্ডার নোটিশ নং ০৪/২০২৫-২৬ (এলটিএম)-এর আওতায় তিনটি উন্নয়ন কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। টেন্ডার আইডি ১৩০০০৩২, ১৩০০০৪৯ ও ১৩০০০৫৬-এর দরপত্র উন্মুক্ত করার পর লটারির মাধ্যমে কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হয়।

টেন্ডার নথি অনুযায়ী, টেন্ডার আইডি-১৩০০০৪৯-এ প্রায় ২৭ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮৩ টাকা ব্যয়ে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হযরত শাহচাঁন্দ আউলিয়া (রহ.) মাজার সড়কে ইউনি ব্লক বসানোর কাজের জন্য ৫৮টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। এ কাজের কার্যাদেশ পায় ‘জাহিন এন্টারপ্রাইজ’।

টেন্ডার আইডি-১৩০০০৩২-এ প্রায় ২৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৯১ টাকা ব্যয়ে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গাজী বাড়ি মোড় থেকে বাইপাস এলাকার আমিরিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা সড়কে ইউনি ব্লক বসানোর কাজের জন্য ৫৯টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এ কাজের কার্যাদেশ পায় ‘সিমিন কনস্ট্রাকশন’। এছাড়া টেন্ডার আইডি-১৩০০০৫৬-এ প্রায় ১৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯৫ টাকা ব্যয়ে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বনবিভাগের বাউন্ডারি ওয়াল সংস্কার, পটিয়া ক্যারাটি ক্লাবে বৈদ্যুতিক সামগ্রী সরবরাহ, ২ নম্বর ওয়ার্ডের একতা আবাসিক এলাকায় রিটার্নিং ওয়াল নির্মাণ এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আবদুস সোবহান বাড়ির সড়কে আরসিসি কাজ বাস্তবায়নের জন্য ৫৬টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। এ কাজের কার্যাদেশ পায় ‘তানজিনা এন্টারপ্রাইজ’।

টেন্ডারের ফল প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন, ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে সমান সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে থাকা ঠিকাদারদের কাজ পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। তাদের দাবি, এই তিনটি টেন্ডারে অংশ নেওয়া অধিকাংশ দরদাতাই ফলাফল দেখে বিস্মিত ও হতাশ হয়েছেন।

বিক্ষোভ শেষে ‘রাকিব এন্টারপ্রাইজ’র স্বত্বাধিকারী রাকিব হাসান বলেন, ই-জিপি পদ্ধতির উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে যদি দেখা যায়, একই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাচ্ছে, তাহলে অন্য ঠিকাদারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবেই। আমরা চাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সন্দেহ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র কৌশলে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে আসছে। তা নাহলে এত বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণকারী থাকার পরও কেন ঘুরেফিরে একই প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে, এই প্রশ্নের জবাব দরকার।

একই ধরনের অভিযোগ তুলেন ‘জামান ট্রেডার্স’র স্বত্বাধিকারী আক্তারুজ্জামান বাবলু বলেন, আমরা নিয়ম মেনে টেন্ডারে অংশ নিই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিই, ব্যাংক গ্যারান্টি দিই। কিন্তু বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। ঠিকাদারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই তিনটি টেন্ডার পুনরায় আহ্বান করা উচিত।

এদিকে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সময় পটিয়া পৌরসভার সদ্য বিদায়ী সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান খন্দকারের উপস্থিতি নিয়েও ঠিকাদারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, টেন্ডারের ফল প্রকাশের সময় তার উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

এ বিষয়ে মিজানুর রহমান খন্দকারকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আমি অফিস টাইমের বাইরে পৌরসভার স্টাফদের চায়ের দাওয়াতে সেখানে গিয়েছিলাম। ওই সময় টেন্ডারের লটারির প্রক্রিয়া চলছিল এবং আমি কেবল তখন উপস্থিত হই। এতে কেউ যদি মনে করে আমি উপস্থিত থেকে কাউকে কাজ পাইয়ে দিয়েছি এটা সঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কেবল উপস্থিত থাকার কারণে আমাকে নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার বাস্তব ভিত্তি নেই।

অভিযোগের বিষয়ে পটিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শ্যামল চন্দ্র বলেন, জাতীয় ই-জিপি সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কোনো সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী যোগ্য দরদাতাই কার্যাদেশ পেয়ে থাকে। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তিনি লিখিতভাবে তা জানাতে পারেন।

পটিয়া পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান বলেন, এ বিষয়টি আমাকে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন। টিকাদারদের পক্ষ হতে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিজে

ksrm