নিপুণ কৌশলে ৩০০ কোটি টাকা যেভাবে পাচার হয়ে গেল

রপ্তানির আড়ালে টাকা পাচার

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে তিন বছরে পোশাক রপ্তানির আড়ালে ১০ প্রতিষ্ঠান ৩০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। মানিলন্ডারিং আইনে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। দীর্ঘ তদন্তের পর ১০ প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ২৩৪টি রপ্তানি পণ্য চালানের বিপরীতে ৩০০ কোটি টাকা পাচারের বিষয়টি উদঘাটিত হয়েছে।

এছাড়া ১০ প্রতিষ্ঠানের বিল অব এক্সপোর্টে জালিয়াতি ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ইএক্সপি ব্যবহার করে পণ্য রপ্তানি করেছে। এই ঘটনায় ১০ প্রতিষ্ঠান ও জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রপ্তানি হওয়া ১ হাজার ২৩৪টি চালানের বিপরীতে পণ্যের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ১২১ মেট্রিক টন। যা ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯১৮ মার্কিন ডলার, তৎকালীন টাকার মূল্যে যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি।

প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্র পর্যালোচনায় শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা দেখেন, টি-শার্ট, টপস, লেডিস ড্রেস, ট্রাউজার, বেবি সেট, পোলো শার্ট, প্রভৃতি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, সৌদি আরব, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রপ্তানি দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হয়েছে।

প্রজ্ঞা ফ্যাশন লিমিটেড

এই প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালে ৩৮৩টি এবং ২০২০ সালে ৮টিসহ ৩৯১টি রপ্তানিচালানের মাধ্যমে অর্থপাচার করেছে। রপ্তানিকৃত পণ্যচালানগুলোতে ৩০৮০ মেট্রিক টন টি-শার্ট, প্যান্ট, টপস, পাজামা প্রভৃতি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ৯২ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার ২৪৫ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের এ অ্যান্ড জে শিপিং কর্পোরেশন, খাতুনগঞ্জের রিয়াংকা ইন্টারন্যাশনাল, দেওয়ানহাটের এঅ্যান্ডজে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, সুগন্ধার জে জে অ্যাসোসিয়েটস, বায়োজিদ বোস্তামির এক্সপ্রেস ফরোয়ার্ডার্স।

Yakub Group

ফ্যাশন ট্রেড

ঢাকার গুলশানের এই প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ৭৩টি, ২০১৯ সালে ১১৬টি, ২০১৮ সালে ৫৭টিসহ ২৪৬টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে। রপ্তানিকৃত পণ্যচালানগুলোতে ১ হাজার ৭৭৯ মেট্রিক টন টি-শার্ট, প্যান্ট, ট্যাংক-টপস, পাজামা প্রভৃতি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সুদান, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। যা প্রায় ৬৮ কোটি ৩৫ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৬ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত দেওয়ানহাটের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এম এ জে শিপিং কর্পোরেশন, খাতুনগঞ্জের রিয়াংকা ইন্টারন্যাশনাল, দেওয়ানহাটের এম অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালসহ আরও কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ ফার্ম।

এমডিএস ফ্যাশন

ঢাকা উত্তরার এই প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ১৮২টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে । রপ্তানিকৃত পণ্যচালানগুলোতে ১৩৭৬ মেট্রিক টন টি-শার্ট ছিল। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি সংশ্লিষ্ট দলিলাদি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পণ্যচালান সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার ও ফিলিপাইনে রপ্তানি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি ১ হাজার ৫৫১টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির দেওয়ানহাটের এম অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও জি আর ট্রেডিং কর্পোরেশন এবং খাতুনগঞ্জের পান বেঙ্গল এজেন্সি লিমিটেড নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জড়িত ছিল।

হংকং ফ্যাশনস লিমিটেড

গাজীপুর টঙ্গীর এই প্রতিষ্ঠান ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২০ সালে ১৫৬টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে। রপ্তানিকৃত পণ্যচালানগুলোতে ১১৬১ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পণ্যচালান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, কাতার, নাইজেরিয়া, কুয়েত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এতে ৪০ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮৬ টাকা পাচার হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট দেওয়ানহাটের এম অ্যান্ড জে শিপিং কর্পোরেশন, খাতুনগঞ্জের পান বেঙ্গল এজেন্সি লিমিটেড, আগ্রাবাদের পরাগ এসএমএস লিমিটেড, খাতুনগঞ্জের রিয়াংকা ইন্টারন্যাশনাল ও সদরঘাটের মেসার্স এ কে এন্টারপ্রাইজ।

থ্রি স্টার ট্রেডিং

ঢাকা বনানীর এই প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ১২০টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে। পণ্যচালানগুলোতে ৮১৬ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। অধিকাংশ পণ্যচালান মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কানাডা মিসরসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এতে ২৫ কোটি ৯২ লাখ ৮ হাজার ৮৬৯ টাকা পাচার হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিঅ্যন্ডএফ এজেন্ট দেওয়ানহাটের এম অ্যান্ড জে শিপিং কর্পোরেশন, খাতুনগঞ্জের পান বেঙ্গল এজেন্সি লিমিটেড, ফকিরহাটের কেআরএস সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড ও আগ্রাবাদেে এঅ্যান্ডজে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।

ফরচুন ফ্যাশন

ঢাকা মিরপুরের এই প্রতিষ্ঠান ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে ৫৯টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। পণ্যচালানগুলোতে ৪৩৫ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। পণ্যচালান সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, মিশর, কানাডাসহ বিভি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এতে ১২ কোটি ৯৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬২৩ টাকা পাচার হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত খাতুনগঞ্জের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রিয়াংকা ইন্টারন্যাশনাল, দেওয়ানহাটের এম অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, সদরঘাটের মেসার্স এ কে এন্টারপ্রাইজ।

অনুপম ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড

ঢাকা কচুক্ষেতের এই প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ৪২টি রপ্তানিচালানের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে। পণ্যচালানগুলোতে ১৯৫ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। রপ্তানি সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পণ্যচালান সংযুক্ত আরব আমিরাত, বেলজিয়াম, নাইজেরিয়া, জর্জিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান ৭ কোটি ৪৪ লাখ ৯৭ হাজার ২০৩ টাকা পাচার করেছে। প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হচ্ছে খাতুনগঞ্জের পান বেঙ্গল এজেন্সি লিমিটেড, দেওয়ানহাটের এ অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, সুগন্ধার জে জে অ্যাসোসিয়েট, আগ্রাবাদের জি আর ট্রেডিং কর্পোরেশন ও এনএইচ কর্পোরেশন ।

পিক্সি নিট ওয়্যারস লিমিটেড

গাজীপুর টঙ্গীর এই প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ২০টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে। পণ্যচালানগুলোতে ১৭০ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। অধিকাংশ পণ্যচালান সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, কুয়েত, ফিলিপাইনস, নাইজেরিয়া, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য ৫ কোটি ৬ লাখ ২৪ হাজার ৩৪১ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিঅ্যন্ডএফ এজেন্ট আগ্রাবাদের জিআর ট্রেডিং কর্পোরেশন ও এন ইচ কর্পোরেশন।

স্টাইলাইজ বিডি লিমিটেড

ঢাকা শাহবাগের এই প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ১০টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে। পণ্যচালানগুলোতে ৬৬.৮ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। অধিকাংশ পণ্যচালান ফ্রান্স, কানাডা, রাশিয়া, স্লোভেনিয়া, পানামাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এসব পণ্যের মূল্য প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৯০২ টাকা । এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আগ্রাবাদের জিআর ট্রেডিং কর্পোরেশন, খাতুনগঞ্জের পান বেঙ্গল এজেন্সি লিমিটেড ও ফকিরহাটের কেআরএস সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড।

ইডেন স্টাইল টেক্স

ঢাকা খিলক্ষেতের এ প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালে ৮টি রপ্তানিচালানে জালিয়াতি করেছে। পণ্যচালানগুলোতে ৪২ মেট্রিক টন টি-শার্ট রপ্তানি করেছে। অধিকাংশ পণ্যচালান টোঙ্গা, ওমান, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এতে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬ টাকা পাচার হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আগ্রাবাদের জিআর ট্রেডিং কর্পোরেশন, খাতুনগঞ্জের পান বেঙ্গল এজেন্সি লিমিটেড ও কেআরএস সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড ।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ঢাকার যুগ্ম পরিচালক মো. শামসুল আরেফিন খান জানান, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিল অব এক্সপোর্টে এবং অন্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি কোড জালিয়াতি করেছে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো পারস্পারিক সহযোগিতা ও যোগসাজশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।

তিনি আরও জানান, এক্ষেত্রে মানিলন্ডারিং হওয়ায় ১০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে ওই রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

এএস/ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!