নরকযন্ত্রণা চট্টগ্রাম কারাগারে, খাবার পায় না বন্দিরা, বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু প্রায়ই

একজনের ছয় ফুট জায়গায় থাকেন সাতজন বন্দি

প্রতিবেশীর করা মামলায় চট্টগ্রাম আদালত ভবনে হাজিরা দিতে আনা হয় মাকসুদকে। আদালতে আনার আগে তাকে ঘুম থেকে তোলা হয় ভোর সাড়ে ৪টায়। এরপর ফাইল তৈরি করে সকালে একটি রুটি খাইয়ে তোলা হয় প্রিজন ভ্যানে। কারাগার থেকে আদালতে আনা হলেও তার জামিনের শুনানি হয়নি ওইদিন। মাকসুদকে আদালত থেকে যখন আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন বিকাল ৪টা। এর মধ্যে সারাদিন তার পেটে পড়েনি কোনো খাবার। আদালতে যখন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন হাত-পা কাঁপছিল মাকসুদের। মাকসুদ শুধু বলছিলেন, ক্ষুধায় তার শরীর গুলিয়ে আসছে। হাত-পা কাঁপছে।

মাকসুদের মতো এমন আরও অনেক বন্দিকেই আদালতে হাজিরা দিতে এসে পড়তে হচ্ছে এমন অসহনীয় দুর্ভোগে, মানবেতর ভোগান্তিতে। তবে কারাগারের বাইরে এসে এভাবে ক্ষিদের জ্বালায় পুড়তে হলেও কারাগারের ভেতরে পোহাতে হয় আরও নিদারুণ কষ্ট। কারাগারে থাকার জায়গার অভাব, এক রুমে গাদাগাদি করে থাকা, গরমের যন্ত্রণার সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসার অভাবও। যে পরিমাণ খাবার একজন কয়েদির জন্য বরাদ্দের কথা সেটুকুও মেলে না তাদের। কারা হাসপাতালে সরঞ্জামের অপ্রতুলতার কারণে এরই মধ্যে কয়েকজন কয়েদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মারাও গেছেন।

জানা গেছে, জেল কোড অনুযায়ী প্রতিজন বন্দির জন্য ছয় ফুট দৈর্ঘ্য ও ছয় ফুট প্রস্থের জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম কারাগারে এ সুবিধার অর্ধেকও পাচ্ছেন না বন্দিরা। বন্দি বেশি হওয়ায় একজনের জায়গায় পাঁচ থেকে সাতজন থাকছেন গাদাগাদি করে। এর সঙ্গে আছে গরমের অসহ্য যন্ত্রণা। বন্দিদের মাথার ওপরে ফ্যানটা ঘুরলেও সেটির বাতাস গা পর্যন্ত এসে পৌঁছায় না। বেশিরভাগেরই ক্যাপাসিটার নষ্ট। আর এই গরমে প্রায় সময় অনেক বন্দি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

বৃহস্পতিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আদালতের হাজতে কথা হয় ফরিদ নামে এক বন্দির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি যে ঘরে থাকি, তাতে ২৭ জন বন্দি থাকে। গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। মাথার ওপরে যেভাবে ফ্যান ঘুরে, তাতে বাতাস লাগে না গায়ে। রাতে বন্দিরা গরমে চিৎকার করতে থাকে। অনেকে কেঁদে কেঁদে বিলাপ করে। দিনের পর দিন এভাবে থাকতে থাকতে বন্দিরা একসময় চুপ হয়ে যায়। অনেকে নিজের জীবন নিজে শেষ করে দেওয়ার কথাও বলে।’

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রোগীদের জন্য প্রতিদিন সবজি, ডাল, মাছ বরাদ্দ থাকে। একদিন পর পর মাছ অথবা মাংস দেওয়া হয়। এছাড়া সপ্তাহে তিনদিন ভাজি-রুটি, দুদিন হালুয়া রুটি এবং বাকি দুদিন খিচুড়ি দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এসব খাবার পান না বন্দিরা। রুটির সঙ্গে হালুয়া দেওয়া হয় একদিন, দুদিন খিচুড়ির বদলে দেওয়া হয় একদিন। সপ্তাহে তিনদিন ভাজি-রুটি দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও ভাজি দেওয়া হয় না বলে জানা গেছে।

খাবার নিয়ে অভিযোগ করে রবিন নামের এক বন্দি বলেন, ‘মাছের পিস এক আঙুলের অর্ধেকেরও কম। মাংসের পিসও তাই। এগুলো থাকলে যা, না থাকলেও তা।’

Yakub Group

রবিন আরও বলেন, ‘খাবার খেয়ে প্রায়দিনই বমি হয়। দুদিন আগে কারা হাসপাতালের বহির্বিভাগে দেখিয়েছি। ডাক্তার প্রস্রাব পরীক্ষা দিয়েছেন। বলেছেন, আমার জন্ডিসের সমস্যা হয়েছে।’

তবে রবিন তিনদিনের মধ্যে আদালতে হাজিরা দিতে আসলেও কারাগারে টেকনিশিয়ান না থাকায় বিলুরুবিন টেস্ট করতে পারেননি। এছাড়া সেখানে ফার্মাসিস্ট দুজনের পদও শূন্য রয়েছে। তাই কারাগারে কোনো ধরনের প্যাথলজি পরীক্ষা হয় না বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার গিয়াস উদ্দিন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘খিচুড়ি দুদিন দেওয়ার কথা থাকলেও তা সবসময় দেওয়া হয় না। সাজাপ্রাপ্ত বন্দির জন্য ২৯১ গ্রাম চাল, বিচারাধীন বন্দির জন্য ২৪৭ গ্রাম চাল, মাছ অথবা মাংস (গরু) ৩৬ গ্রাম ও মুরগি ৩৭ গ্রাম বরাদ্দ রয়েছে। আর থাকে সিজনাল সবজিও।’

এছাড়া কারাগারে এভাবে থাকতে গিয়ে মানসিক অসুস্থতার শিকার হচ্ছেন বন্দিরা। কিন্তু বন্দিদের মানসিক চিকিৎসার জন্য কারাগারে একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্ট থাকার কথা থাকলে সেই পদ শূন্য রয়েছে।

চট্টগ্রাম আদালতের হাজতে হাজিরা দিতে আসা জ্যোতি দে নামের এক বন্দি বলেন, ‘কারা হাসপাতালে ইসিজি মেশিন থাকলেও বেশিরভাগ সময় তা নষ্ট বলা হয়। আমার রুমে কিছুদিন আগে রাত দেড়টার দিকে এক বন্দির প্রচণ্ড বুক ব্যথা শুরু হয়। কারা হাসপাতালে নিয়ে গেলে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়। ওয়ার্ড থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় কাররাক্ষীরা তামাশা করে বলতে থাকেন, হাসপাতালে গিয়ে কী লাভ! বুকে পাথর দিয়ে শুয়ে থাকেন, ব্যথা কমে যাবে। ইসিজি মেশিন নষ্ট থাকায় তারা রাতে ইসিজি করায়নি। তারপর চট্টগ্রাম মেডিকেলে পরের দিন নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।’

গত ৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম কারাগারে ঘণ্টার ব্যবধানে দুই কয়েদির মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের রফিক উদ্দিন (৪৫) মারামারির এক মামলায় কারাগারে ছিলেন। অপরজন একই উপজেলার হাছনদণ্ডী গ্রামের বাবুল মিয়া (৪০) মাদক মামলায় কারাগারে ছিলেন।

এর আগে ফেব্রুয়ারিতে আরেক বন্দি বুকে ব্যথা নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর মারা যান। গত কয়েক মাসে আরও কয়েকজন বন্দির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম কারাগারে।

চট্টগ্রাম কারাগারের আবাসিক চিকিৎসক শামীম রেজা বলেন, ‘বুকের ব্যথা নিয়ে কোনো বন্দি কারা হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে প্রথমে ইসিজি করানো হয়। কিন্তু চিকিৎসক স্বল্পতা, ইসিজি মেশিন মাঝে মাঝে বিকল থাকায় রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু এ অবস্থায় হৃদরোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। হৃদরোগীর জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা কারাগারেই হওয়া উচিত।’

ডিজে/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm