প্রায় ২০ বছর পর গঠিত হতে যাওয়া চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের আওতাধীন থানা কমিটি নিয়ে পদপ্রত্যাশী ছাত্রলীগের নেতাকমীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। নগর ছাত্রলীগের সভাপতি বলছেন, নগরীর আওতাধীন ১৬ থানার কমিটি গঠনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। শিগগিরই ঘোষিত হবে থানা কমিটিগুলো।
তবে প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দস্তগীর চৌধুরী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ করলেও বিষয়টি না জানানোর অভিযোগ মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাদের। যদি মেয়রপন্থীদের না জানিয়েই থানা কমিটি গঠন করা হয় তাহলে পাল্টা কমিটি গঠনের ঘোষণাও এসেছে তাদের কাছ থেকে।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে এম আর আজিম ও সালাউদ্দিন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের ১৩ বছর পর ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর কেন্দ্র থেকে ২৪ জনের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা ইমরান আহমেদ ইমুকে সভাপতি ও এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে এ কমিটি ঘোষিত হয়েছিল। তারা দুজনেই প্রয়াত নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। এ কমিটি বাতিলের দাবিতে একটি পক্ষ প্রায় ৮ মাস আন্দোলন সরগরম করে রেখেছিল নগরীর রাজপথ। পরবর্তীতে পদবঞ্চিতদের আন্দোলন পরিণত হয় ক্ষোভে। নগরীর সার্কিট হাউজে দুই গ্রুপ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এর মাসছয়েক পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিলেও কোনও থানা ও ওয়ার্ড কমিটি করতে পারেনি ইমু-রনির নেতৃত্বে নগর ছাত্রলীগ। তবে ছাত্রবান্ধব কাজ করে প্রশংসিত হয়েছে নগর ছাত্রলীগ।

কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলেও প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ও আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারীদের মাঝে বিভাজন থাকায় ছাত্রলীগের রাজনীতি চলতো দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে। এরই মাঝে নানা বিতর্কে জড়িয়ে নিজ পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি। তার স্থলাভিষিক্ত হন জাকারিয়া দস্তগীর। তিনিও মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী।
এরই মাঝে গত বছর মেয়র নাছিরের অনুসারীদের বাদ দিয়ে বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড কমিটি গঠন করেন ইমু-দস্তগীর। তখন এর বিরোধিতা করে পাল্টা কমিটি গঠন করেন মেয়র অনুসারী ছাত্রলীগের নেতারা। এরপর নগর ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করার দাবি তোলেন মেয়রপন্থি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে বর্তমান শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান নওফেলের অনুসারীরা তখন কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দাবি করলে পরে কমিটি বিলুপ্তি ও কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নগর ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার আন্দোলন করে এমনকি কেন্দ্রীয়
ছাত্রলীগের কাছে অভিযোগ দিয়েও বিলুপ্ত করতে পারেননি মেয়রপন্থি ছাত্রলীগ নেতারা।
এরকম পরিস্থিতিতে ইমু-দস্তগীর নতুন করে ওয়ার্ড কমিটি না হলেও অন্তত নগরীর ১৬ থানার ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মূলত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নগর ছাত্রলীগের কমিটি গঠন সম্মেলনের মাধ্যমে করার জন্যই এ উদ্যোগ বলে ধারণা ছাত্রলীগের একটি পক্ষের। থানা কমিটিতে ইমু-দস্তগীর নিজেদের অনুসারীদের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সম্মেলনে কাউন্সিলরশিপ নিশ্চিত করতে চান। এর মধ্য দিয়ে মেয়র নাছিরের অনুসারীরা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাউন্সিলর হতে পারবে না। ফলে নগর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ নির্বাচনের আইনি অধিকারও হারাবেন এর মধ্য দিয়ে।
জানতে চাইলে নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, ‘নগরের আওতাধীন থানা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক থানার কমিটি গঠন শেষ হয়েছে। সুবিধামত সময়ে ঘোষণা করা হবে থানা কমিটিগুলো।’

কমিটি গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের সাংগঠনিক বিষয়। তা প্রকাশ করব না। তবে যে থানায় যেরকম কমিটি গঠন করা যায় সেরকমই হবে।’ কোনও থানায় আহ্বায়ক আবার কোনও কোনও থানায় ২০ থেকে ৩০ বা তারও বেশি সদস্য দিয়ে থানা কমিটিগুলো করা হবে বলে ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল এক নেতা জানিয়েছেন। তবে তারিখ নির্দিষ্ট করে জানা না গেলেও কোরবানির ঈদের আগে বা পরে এসব থানা কমিটি গঠন করার আভাস পাওয়া গেছে।
ইমু-দস্তগীরের নেওয়া এ উদ্যোগ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মেয়রপন্থি হিসেবে পরিচিত নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মইনুর রহমান মইন বলেন, ‘থানা কমিটি গঠন নিয়ে তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। তবে অতীতেও সমন্বয় ছাড়া ২-৩টি ওয়ার্ড কমিটি দিয়েছিল। আমরাও প্রকৃত ছাত্রদের দিয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ে শক্তিশালী পাল্টা কমিটি দিয়েছিলাম। এবারও যদি সমন্বয় না করে থানা কমিটি গঠন করে আমরা অতীতের মত জবাব দেব।’
প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর পর হলেও থানা কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানিয়ে আজিম-সালাউদ্দিন কমিটির দপ্তর সম্পাদক ও এমইএস কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আরশেদুল আলম বাচ্চু বলেন, ‘আমরা অনেকবার উদ্যোগ নিয়েও দুই একটি থানায় আহ্বায়ক কমিটি দিতে পেরেছিলাম। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে ইমু-দস্তগীর থানা কমিটি গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে শুনলাম তা যদি সফল হয় ছাত্রলীগের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। নেতৃত্ব তৈরি হবে।’
অন্যদিকে মেয়রপন্থি হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের সময় আমরা যারা সাবেক ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ আছি তাদের সাথে পরামর্শ করা উচিত। কিন্তু ইমু-দস্তগীর এখনো যোগাযোগ করেনি। এমনকি নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকেও অবগত করেননি বলে জানি।’
ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন নগর আওয়ামী লীগের কারো সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, ‘এখানে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনে আওয়ামী লীগের কাজ কী? ছেলেদের কাজে বুড়ার কোনও কাজ নেই।’ তার এ মন্তব্য প্রকাশ করার অনুরোধও করেন নগর ছাত্রলীগের এ সভাপতি।




