৬ মাসে নগর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগী তিন!

সিটি করপোরেশনের ক্রাশ প্রোগ্রামের সুফল নিয়ে সন্দেহ

0

নুসরাত সাবিলার বয়স সাড়ে তিন বছর। টানা দশদিন জ্বরে কাতর শিশুটি। জ্বর না কমায় উপায়ন্তর না দেখে মা নাবিলা হক ছুটে এলেন মেডিকেলে। ডেঙ্গু শনাক্ত না হলেও জ্বর না কমায় চিন্তিত বাবা সাইফ হক। শিশু সাবিলাতের পাশে ম্লান মুখে বসে আছেন মা। নানী চোখ মুছতে মুছতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। শিশুটির বাবা মুঠোফোনে বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন রক্তের জন্য। শিশুটির জন্য এ-পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন। সাত মাস বয়সে শিশুটির প্রথম ডেঙ্গু হয়েছিল। যদি প্রয়োজন পড়ে, সে ভয় থেকে আগেভাগে রক্তের ব্যবস্থা করে রাখছেন।

বিকেলে নুসরাত সাবিলাতকে রক্ত পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়। বাবা সাইফ হক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি অসহায় হয়ে পড়েছি। মেয়েটার খুব ছোট বয়সে একবার ডেঙ্গু হয়েছিল। আমার ঘর পরিষ্কার থাকলেও আমার চারপাশ তো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। অথচ এসব কারোর চোখেই পড়ছে না।

‘এখন শুনছি মশা মারার ওষুধ দিচ্ছে। কিন্তু চারপাশ তো পরিষ্কারের বালাই নেই। সরকারও নির্বিকার। এই দায়দায়িত্ব সরকার বা মেয়র এড়াতে পারেন না। তাদের ব্যর্থতার কারণে আমরা কেন হাসপাতালে এত টাকা ব্যয় করব?’—বললেন তিনি।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, রাজধানীতে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ঢাকায় এরই মধ্যে এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১১ জন। এর আগে ৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছিল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। গত বছর একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের। সরকার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের যে সংখ্যা প্রচার করছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। তবে চট্টগ্রাম নগরীতে এর প্রভাব এখনও পরিলক্ষিত হয়নি।

সিভিল সার্জন ডা.আজিজুর রহমান সিদ্দিকী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানায়ন, ‘ঢাকায় এর প্রকোপ বাড়লেও আমাদের এখানে এখনও দেখা যায়নি। গত ছয় মাসে নগরীতে ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র তিন জন। তারা সুস্থ হয়ে বাসায়ও ফিরে গেছেন।’

সিভিল সার্জনের দেওয়া তথ্য অনুসারে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে একজন আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। জুনের মাঝামাঝি সপ্তাহে একজন জেনারেল হাসপাতালে আর সর্বশেষ জুলাইয়ের ২ তারিখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে একজন ভর্তি হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেল কয়েক বছরের তুলনায় রাজধানীতে এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জুলাই মাসে গতকাল পর্যন্ত ১২ দিনে মোট ১ হাজার ৬৪৩ জন আক্রান্ত রোগী সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১৩৭ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী এ বছর রাজধানীতে এখন পর্যন্ত দুই হাজার ১০০ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের তালিকা অনুসারে বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ১ হাজার ৫৯ জন।

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দারাও। আবার সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তথ্য জোগাড় করতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যেসব হাসপাতালের তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তাও আংশিক। অন্যদিকে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক দেখে অনেকেই ভাবছেন, হাসপাতালের বাইরে অনেক রোগী চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নিচ্ছে। সেই তথ্য কারও কাছে নেই।

নুসরাত সাবিলাতের মা নাবিলা হক বলেন, ‘ঢাকায় আমার এক আত্মীয় জানালো সিটি করপোরেশন যে ওষুধ ছিটায় তা অকার্যকর। না জানি আমাদের এই শহরের কী দশা!’

বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সোমবার (১৫ জুলাই) নগরীতে মশা নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ৪১টি ওয়ার্ডজুড়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে। যার পরিচালনায় ব্যয় করা হচ্ছে প্রায় ২ কোটি টাকা। তবে এ ক্রাশ প্রোগ্রামে আদৌ কোনো সুফল মিলবে কিনা – এ নিয়ে সন্দেহ আছে নগরবাসীর মধ্যে।

এসআর/সিপি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন