দেশের টাকা বিদেশে পাচার, আমদানিকারক সিঅ্যান্ডএফ অচ্ছেদ্য চক্র

0

আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ— এ যেন অচ্ছেদ্য চক্র। এই দুই চক্রের পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের পথ ধরে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অংকের অর্থ। পণ্যের মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অর্থ পাচার করা হয়ে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় এক পণ্যের বদলে অন্য পণ্য নিয়ে এসেও অর্থ পাচার করা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে শুল্ক ছাড়া পণ্য বের করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে অর্থ পাচারের এমন ঘটনা অহরহ ঘটলেও বেশিরভাগ ঘটনাই থেকে যায় আড়ালে। ধরা পড়া ঘটনায় মামলাও হয় তুলনামূলক সামান্যই। ডিসেম্বরের ২৫ ও ২৬ তারিখ অর্থপাচারের চারটি মামলায় আসামি হয়েছেন ১৫ জন। আসামিদের সবাই চট্টগ্রাম ও ঢাকার আমদানিকারক এবং সিএন্ডএফ এজেন্ট। দুটি মামলায় জেটি সরকারও হয়েছেন আসামি।

পুটি সিল্যান্টের চালানে প্রসাধন সামগ্রী
ঢাকার গুলশান বাড্ডা এলাকার আমদানিকারক ইখলাস ট্রেডিং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১০ হাজার ৮২০ কেজি পুটি সিল্যান্ট আমদানির জন্য ৯ হাজার ২৬৪ ডলারের ঋণপত্র খোলে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ঢাকার উত্তরা শাখায়। পরে এই চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এলে তাতে পুটি সিল্যান্টের বদলে পাওয়া যায় ১১ হাজার ৭৭৬ কেজি উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী সামগ্রী। এমন অবস্থাতেই আনস্টাফিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে প্রসাধনী সামগ্রীর ওই চালান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের করে নিয়ে যায় আমদানিকারক ইখলাস ট্রেডিং এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট তানজিনা ইন্টারন্যাশনাল। গোপনে খবর পেয়ে কাস্টমসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের এক্সেস রোড থেকে চালানটি আটক করে। এ ঘটনায় প্রায় এক কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

গত ২৫ ডিসেম্বর অর্থপাচারের এই ঘটনায় বন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় ইখলাস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী কাজী জাহিদুল ইসলাম (৩০) ও খালাসের সহযোগী চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট তানজিনা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. আলমগীর সরকারকে (৪৩) আসামি করা হয়।

ঘোষণা ৯৬৫, আসলো ১০
২০১৬ সালের আগস্ট মাসে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকার আমদানিকারক লাকী ট্রেডিং ইউক্রেন থেকে ৯৬৫ টন সরিষা আমদানির ঘোষণা দেয়। এজন্য চট্টগ্রামের জুবলী রোডের সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে চার লাখ ৩৩ হাজার ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়। ৪ সেপ্টেম্বর ৪৩টি কনটেইনারের চালানটি খালাসের জন্য শুল্কায়ন সম্পন্ন করার পরই কায়িক পরীক্ষায় ধরা পড়ে ঘোষিত এক হাজার টন সরিষার বদলে চালানে আছে মাত্র ১০ টন। কম পণ্য আমদানির আড়ালে পুরো টাকাই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় ৪ লাখ ১২ হাজার ৩৪৭ ডলার পাচার হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। যা বাংলাদেশি টাকায় ৩ কোটি ২৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

অর্থপাচারের এই ঘটনায় ২৬ ডিসেম্বর বন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় আমদানিকারক চট্টগ্রামের নুর আহমদ সড়কের লাকী ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. ইউসুফ চৌধুরী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স এইচকেএন কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান তাহেরা আক্তার মরিয়ম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদ উল্লাহ, পরিচালক মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম ও মোহাম্মদ ওয়াহিদ উল্লাহকে।

পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে অর্থপাচার
চট্টগ্রামের সদরঘাটের আমদানিকারক জেবিএফ ফুটওয়্যার চীন থেকে দুটি চালানের মাধ্যমে সাত হাজার ৫০ কেজি পিভিসি আপার অফ স্লিপার এবং ১৪ হাজার ১০০ কেজি আউটার সোল অফ দ্য স্লিপার আমদানির ঘোষণা দেয়। এজন্য অগ্রণী ব্যাংকে দুটি ২১ হাজার ১৫০ ডলারের দুটি ঋণপত্র খোলা হয়। পরে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যের চালান আসার পর দেখা যায়, ঘোষিত পণ্যের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ পণ্য তারা নিয়ে এসেছে। পরীক্ষায় দেখা যায়, আমদানি করা পিভিসি আপার অফ স্লিপারের পরিমাণ ১০ হাজার ৭০২ কেজি এবং আউটার সোল অফ দ্য স্লিপারের পরিমাণ ২১ হাজার ৬১২ কেজি। ঘোষণা ছাড়া অতিরিক্ত পণ্য আমদানিই শুধু নয়, চালানে আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে বিদেশে অর্থও পাচার করে আমদানিকারক জেবিএফ ফুটওয়্যার। এই আমদানিকারক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অন্তরালয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে বিনা শুল্কে পণ্য খালাসেরও চেষ্টা করে।

অর্থপাচার ও জালিয়াতির এই ঘটনায় ২৬ ডিসেম্বর বন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে জেবিএফ ফুটওয়্যারের স্বত্বাধিকারী ফয়েজ আহম্মেদ (৩৫), সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অন্তরালয়ের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম (৪৬) এবং অন্তরালয়ের জেটি সরকার মো. তৌহিদুল ইসলামকে (২৭)।

আমদানির আড়ালে অর্থপাচার
মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির মাধ্যমে অর্থপাচারের ঘটনায় ২৬ ডিসেম্বর দায়ের করা অপর এক মামলায় আসামি করা হয়েছে ঢাকার মোহাম্মদপুরের আমদানিকারক হং কং সেলের স্বত্বাধিকারী কাইয়ুম মিয়া, চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ট্রিকম ফ্রেইট অ্যান্ড লজিস্টিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নারায়ণ চন্দ্র ঘোষ কাজল, পরিচালক তরুণ কুমার ঘোষ ও স্বপন কুমার মুখার্জি এবং জেটি সরকার একরামুল হককে।

এএস/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন