দুর্নীতির দুর্বহ ভার বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কাঁধে

দুষ্টচক্রের প্রশ্রয়ে জিএম

0

দীর্ঘদিনের পথচলায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্র (সিটিভি)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দর্শক খরা কাটছে না সিটিভির। অন্যদিকে কেন্দ্রটি চালুর পর থেকেই নানা আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির কথা শোনা যাচ্ছে। প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাড়েনি অনুষ্ঠানের মান।

অভিযোগ রয়েছে, অযোগ্য-অপেশাদার লোকজন টাকার বিনিময়ে যুক্ত হচ্ছে সিটিভির অনুষ্ঠানে। টাকা দিলেই শিল্পী, গীতিকার, সুরকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া যায়। নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া প্রায় সকল সাবেক‘জেনারেল ম্যানেজার’র বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ-অনুযোগের পর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বদলি হলেও দুর্নীতির ঘটনাগুলো বরাবরই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

সাবেক ম্যানেজারদের পথ ধরে সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) নিতাই কুমার ভট্টাচার্য’র বিরুদ্ধেও যেন একের পর এক অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেছে চট্টগ্রামের শিল্পীরা।

শিল্পীরা বলছেন, ‘ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই লোক দিয়ে নির্মিত হচ্ছে সিটিভির অনুষ্ঠান। জিএম নিতাই কুমারের অদক্ষতা ও অনিয়মের কারণে চট্টগ্রাম টেলিভিশন একটি হাস্যকর ও দর্শকশূন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু সংগীত পরিচালককে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যাদের অনেকের শিল্পী হিসেবেও তালিকাভুক্তি নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ

গত বছর অক্টোবরে এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ করে শিল্পীরা। ওই অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিতাই কুমার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই নির্দিষ্ট কিছু‘দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও দালাল সিন্ডিকেট’ চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্রকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই অনুষ্ঠান ইজারা দিয়ে সিডিউল তৈরি এবং বন্টন করা হয়। অর্থের বিনিময়ে এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্টন করার কারণে তালিকাভুক্তি শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিল্পী সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক শিল্পী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কতটুকু সত্য জানি না। তবে তাঁর পছন্দের লোকজন দিয়ে প্রোগ্রাম করানো হচ্ছে এ কথা শতভাগ সত্য।’

দুর্নীতি, অপকর্ম ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ দুদকে

নিতাই সিন্ডিকেটের হয়রানির শিকার হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র বরাবরে একটি অভিযোগ করেছেন শিল্পীরা। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এক নারী শিল্পী চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্রে উপস্থিত হলে অশোভন ইঙ্গিত করেন জিএম নিতাই। এছাড়াও ‘নিতাই সিন্ডিকেটের’ সদস্য সুকুমার বিশ্বাস (পিএস টু জিএম) এক শিল্পীকে কুপ্রস্তাব দিয়ে উল্লেখ করেন যে,‘জিএম নিতাই ইয়াং নারীদের প্রতি দুর্বল।’

সর্বশেষ আদালতে মামলা

জিএম নিতাই কুমার ভট্টাচার্য্যের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা এবং মানহানিকর মন্তব্য করার প্রতিবাদে মামলা করেছেন স্বপন কুমার দাশ নামের এক কন্ঠ শিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক।

মামলা সূত্রে জানা যায়, একটি অনুষ্ঠানের কথোপকথনের এক পর্যায়ে জিএম নিতাই ওই শিল্পী এবং তার প্রয়াত পিতা মোহন লাল দাশ সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জিএম নিতাই কুমার ভট্টাচার্য্যের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। কে, কখন, কোথায় মামলা করেছে আমি জানিনা।

অনুষ্ঠান বন্টনে স্বজনপ্রীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগেকার যে কোনও সময়ের চেয়ে বর্তমান সিটিভি অনেক সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।’

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গন সংশিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামের শিল্পী সমাজ টিভি কেন্দ্রীক অনুষ্ঠান নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। এক গ্রুপ সরকারি দলের কেউ না হয়েও ক্ষমতাসীনদের লোক- এমন ভাব দেখিয়ে নানা সুবিধা নেয়। এরা প্রভাব খাটিয়ে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যে জিএমই আসুক তাকে করতলে নিয়ে নেয়। আবার পছন্দ না হলে প্রতিপক্ষ বানিয়ে জিএম বিরোধী অবস্থান গড়ে তোলে। এরা স্ক্রিনে ঘন ঘন চেহারা দেখায়, প্রোগ্রাম বেচাকেনা করে। এই চক্রের উপকারভোগী জিএম থাকে আড়ালে।

আর এক পক্ষ এদের চেয়ে কম সুবিধা ভোগী। তারা বঞ্চিত ভাবে নিজেদের। সুবিধা না পেয়ে ছিদ্রান্বেষনে তৎপর থাকে এরা।

এই দলাদলির বলি দিনের পর দিন বিপুল সরকারি অর্থ অপচয় করে বস্তাপচা অনুষ্ঠান উপহার দেয়ার প্রতিষ্ঠান বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র। ধার দেনা জোড়াতালির অনুষ্ঠান দিয়ে চলা এই প্রতিষ্ঠান উপর থেকে নিচের চিহ্নিত একটা চক্রের ধান্দা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দর্শক বিমুখ এ কেন্দ্রের জিএম সহ কর্তাদের ধারণা, ‘তারা যা দেয় পাবলিক তা খায়’। কোনও কোনও জিএম অর্থ ও নারী কেলেঙ্কারির জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।

বর্তমান জিএম’র সময় সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া সংবাদ পাঠক সহ বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগের লক্ষে অডিশনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে- শিল্পীর গুন বিচারে নয়, বিশেষ মহলের স্বার্থ বিচারে এসব অডিশনের ফল দেয়া হয়েছে।

দর্শকদের অভিমত, বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জন্য বাজেট বাড়ে, সম্প্রচার সময় বাড়ে, শুধু বাড়ে না অনুষ্ঠানের মান, থাকে না সৃজনশীল কোনও পরিকল্পনা।

এসএ

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন