s alam cement
আক্রান্ত
১০১৬৩০
সুস্থ
৮৬৬০৯
মৃত্যু
১২৯৩

দুপুরের আগে পুকুরে ডোবে শিশুরা, চট্টগ্রামেই বিপদ বেশি

পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু চট্টগ্রাম বিভাগে

0

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। ইসমাইল তখনও বাড়িতে ফেরেনি। খোঁজ শুরু হয় চারদিকে। হঠাৎ নজরে পড়ে বাড়ির পাশের পুকুরে ভাসছে তার জুতো জোড়া। বুঝতে আর কারও বাকি থাকে না— ৬ বছরের ইসমাইলের ছোট্ট শরীরটা গভীর ওই পুকুরের পানির নিচে। কখন সে সবার চোখের আড়াল হয়ে বাড়ির পাশের পুকুরে চলে গেছে— বুঝতেই পারেনি কেউ। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইছাখালীতে এই মর্মান্তিক ঘটনা মাত্র এক মাস আগের— ২৯ আগস্ট।

রাউজানের কদলপুরে ৩ বছর বয়সী অভয় গত ২১ সেপ্টেম্বর সকালে খেলতে খেলতে হঠাৎ বাড়ির পেছনের পুকুরে পড়ে যায়। কারোরই চোখে পড়েনি। একসময় তার নিথর দেহটা পানির ওপরে ভেসে ওঠার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। এর মাত্র কিছুদিন আগে রাউজানের শমসেরনগরে পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বোন— সাকিবা (৬) ও আনিছা (৬)। পুকুরপাড়ে খেলার একপর্যায়ে আনিছা পুকুরে পড়ে গেলে তাকে বাঁচাতে গিয়ে সাকিবাও একইসঙ্গে ডুবে যায়।

শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ৮ বছরের শিশু তাইহান আছরের নামাজ পড়তে ঘর থেকে বের হয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরে না ফেরায় বাড়ির লোকজন তাকে খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে বাড়ির পাশের পুকুর ঘাটে তার জুতা দেখতে পেয়ে লোকজন পানিতে খুঁজতে থাকেন। শেষে আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় পুকুর থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের ধারণা, পুকুরে অজু করতে নামার সময় পা পিছলে সে পানিতে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেনি।

একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম
একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম

পুকুরে ডুবেই শুধু নয়, অন্যভাবেও ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। গত শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুই বছরের শিশু রায়হান দুপুরের দিকে উঠানে খেলার সময় পাশে রাখা এক পানিভরা বালতিতে পড়ে যায়। সেখান থেকে শিশুটি আর ওঠে দাঁড়াতে পারেনি। ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের যখন চোখ পড়ে তার ওপর, ততোক্ষণে সে আর বেঁচে নেই।

মৃত্যু বেশি চট্টগ্রাম বিভাগেই

প্রায় প্রতিদিনই পানিতে ডুবে মৃত্যুর এমন ঘটনা গণমাধ্যমে আসলেও আরও অনেক ঘটনা থেকে যায় অন্তরালে। তবে বেসরকারি সংস্থার গবেষণা জানাচ্ছে, দেশে প্রতিদিনই পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে প্রায় ৪০ জন— যার প্রায় সকলেই শিশু। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে সাড়ে ১৪ হাজার শিশু মারা যায়। এদের বয়স ১ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। আর পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রাম বিভাগেই। তবে জেলার হিসাবে শীর্ষে কুড়িগ্রাম।

পানিতে ডুবে মৃত্যু নিয়ে কাজ করে থাকে গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগ বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘সমষ্টি’। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত ১৯ মাসব্যাপি চালানো তাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯ মাসে পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এ সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সবগুলো জেলায় অন্তত ২৭১ জন পানিতে ডুবে মারা গেছে। ২২৮ জনের মৃত্যু নিয়ে এরপরই আছে ঢাকা বিভাগ।

সকাল থেকে দুপুর— বিপজ্জনক সময়

গবেষণা থেকে জানা যায়, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ৯১ শতাংশের বয়সই ১৮ বছরের কম। এর মধ্যে চার বছর বা তার চেয়ে কম বয়সীদের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ৫৬২ জন— শতাংশের হিসাবে ৪২। পাঁচ থেকে নয় বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৪৬২ জন— শতাংশের হিসাবে ৩৫। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ১৫২ জন এবং ১৫ থেকে ১৮ বছরের ৩৮ জন। আর পানিতে ডুবে ১৮ কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়সীদের মৃত্যু হয়েছে ১১৮ জনের।

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে যাওয়ার ৭৯ ভাগ ঘটনাই হয় দিনের বেলায়। ১৯ মাসের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে আবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ৫৩৭ জন এবং দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগে ৫১৭ জন মারা গেছে। পানিতে ডোবার ৬৮ শতাংশ ঘটনাই ঘটে সকাল নয়টা থেকে দুপুর একটার মধ্যে। এর বেশিরভাগই ঘটে পুকুরে (৬৬ শতাংশ) এবং বাড়ি থেকে ৪০ কদমের মধ্যে অবস্থিত খাদে (১৬ শতাংশ)।

গবেষণা থেকে জানা যায়, বর্ষাকাল ও এর আগে-পরের মাসগুলোতে (জুন থেকে অক্টোবর) পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঘটে। ১৯ মাসের বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর এক হাজার ৩৩২টি ঘটনার মধ্যে এক হাজার ৩০৫টিই ঘটেছে পরিবারের সদস্যদের অজান্তে বা পরিবারের নজরদারির অভাবে।

বছরে ১০ হাজার শিশুর মৃত্যু পানিতে

দেখা গেছে, বাংলাদেশে জ্বর, জন্ডিস কিংবা জটিল ডায়রিয়ার চেয়েও পানিতে ডুবে বেশি মারা যায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২০’-তে দেখা যায়, দেশে ৫ বছরের কম বয়সী ৯ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুসারে, ১২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এই বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি ১ লাখে প্রায় ৭২ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। অন্যদিকে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতি ১ লাখে ডুবে মারা যায় প্রায় ২৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ পরিচালিত আরেক জরিপে দেখা যায়, প্রতিবছর সব বয়সী প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ আনুমানিক ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এই হিসাবে দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের শিশুরা পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মারা যাচ্ছে ৩০ জন। বছরে এই সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।

বাঁচার উপায় কী?

দেশের এ বছরই প্রথম ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। তবে নিউমোনিয়ার পরই বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ পানিতে ডুবে হলেও এটি প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে শিশুদের সাঁতার শেখানোর কয়েকটি কর্মসূচি পালন করা হয়। সদ্য শেষ হওয়া এরকম এক কর্মসূচির অধীনে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ ও নড়াইল জেলার ২ লাখ ৯৮ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হয়েছে— এমন দাবি করা হয়। কিন্তু মৃতের সংখ্যার বিপরীতে এমন দাবি খুব বিশ্বাসযোগ্য বলেও মনে হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে যে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কথা বলেছে তাদের নির্দেশিকায়, তার মধ্যে রয়েছে পুকুর ও ডোবার পাড়ে বেড়া দেওয়া এবং স্কুলগামী শিশুদের সাঁতার শেখানো। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, সাঁতার শেখার আগের বয়সেই যেহেতু অনেক শিশু ডুবে মারা যাচ্ছে, অনেক সময় আবার বালতি বা হাড়ির পানিতেও ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে— এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন থাকার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স পাঁচ বছর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে সাঁতার শেখানো গেলে প্রায় ৯০ শতাংশ মৃত্যু ঝুঁকি কমে যায়।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm