দুটি শাটলই ভরসা চবির ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর, ৪৪ বছরেও বাড়েনি একটি ট্রেন

৫ হাজার শিক্ষার্থীর গণস্বাক্ষর ট্রেন বাড়ানোর দাবিতে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি শাটল ট্রেনের সংখ্যা। ৪৪ বছর ধরে ওই দুটি শাটল ট্রেন দিয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত। পাঁচ বছর আগে রেলমন্ত্রী ট্রেন বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি এখনও। এতে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেকে ট্রেনের ছাদে ঝুঁকি নিয়ে আসা যাওয়া করে।

প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ১৪ বার আসা-যাওয়া করা এই ট্রেনে পাওয়ার কার না থাকায় গরমে কাহিল হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থা। এর সঙ্গে গাদাগাদি করে আসা-যাওয়া করার কারণে ভিড় ও গরম সহ্য করতে না পেরে প্রায় শিক্ষার্থীদের অজ্ঞান হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমনকি শাটল ট্রেনের সময়সূচি বাড়ানোর আবেদন করলেও সাড়া মেলেনি রেলওয়ের কাছ থেকে।

এদিকে শাটল ট্রেন বাড়ানোর দাবিতে চবি’র পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর গণস্বাক্ষর করা আবেদন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, শাটল ট্রেন বাড়ালে অবকাঠামোগত পরিবর্তনও করতে হবে। রেললাইন ডাবল করতে হবে, জনবল বাড়াতে হবে। চবিতে তৈরি করতে হবে স্টেশনও।

জানা গেছে, ১৯৮০ সালে পাঁচটি বগি নিয়ে চালু হয়েছিল পাঁচ বগির একটি শাটল ট্রেন। তবে বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে চবি পর্যন্ত সিঙ্গেল রেললাইনে চলে দুটি ট্রেন। ক্যাম্পাস খোলা থাকলে দুটি ট্রেন ক্যাম্পাস ও শহর রুটে ১৪ বার আসা-যাওয়া করে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন। শাটলে পর্যাপ্ত আসন, ট্রেনে পাওয়ার কার সংকটের কারণে ফ্যান অচল। তাই তীব্র গরমের মধ্যে গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়া করতে হয়। গরমকালে প্রায়ই কয়েকজন শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে যায়।

একইসঙ্গে ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে উঠতে হয় শাটলের ছাদেও। আর এতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। বর্তমানে চবিতে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। বছরে বছরে শিক্ষার্থী বাড়লেও বাড়েনি ট্রেনের সংখ্যা।

এর মধ্যে চবি কর্তৃপক্ষ শাটলের সময়সূচি বাড়ানো জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সুফল মেলেনি।

আরও জানা গেছে, ২০১৯ সালে রেলমন্ত্রী একটি নতুন শাটল ট্রেন দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু সেই ঘোষণা এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি।

বৃহস্পতিবার (৩০ মে) নতুন একটি শাটলের দাবিতে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর গণস্বাক্ষর করা আবেদন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে চবি উপচার্য মো.আবু তাহেরের তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শিডিউল না পাওয়ায় তা দিতে দেরী হচ্ছে। এর আগে চবি কর্তৃপক্ষ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএমসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত ২৮ মে একই দাবিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবরেও একটি স্মারকলিপি জমা দেন।

এখন যেভাবে চলছে শাটল ট্রেন

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, চবির প্রথম শাটল ট্রেন চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় ছাড়ে। দ্বিতীয়টি ছাড়ে সকাল ৮টায়। মূলত এই ট্রেন দুটিতেই শিক্ষার্থীদের বেশি ভিড় থাকে। এই ট্রেন দুটি চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে চবি ছেড়ে আসে যথাক্রমে সকাল ৮টা ৪৫ এবং ৯টা ২০ মিনিটে।

এর মধ্যে নাজিরহাট লোকাল ট্রেনটি সকাল ৬টায় থেকে ষোলশহর রেলস্টেশনে চবির সাড়ে ৭টার শাটলের সঙ্গে ক্রসিং হয়। রেললাইন ডাবল না হওয়ার কারণে চবির শাটলটি স্টেশনে লুপলাইনে অপেক্ষা করে নাজিরহাট লোকালটি ক্রস না করা পর্যন্ত।

এরপর ষোলশহর থেকে ৯টা ৪৫ এবং ১০টা ৪০ মিনিটে আবারও শাটল ট্রেন দুটি ছেড়ে যায়। সে দুটি চবিতে পৌঁছে ১০ ২০ এবং ১১টা ২০ মিনিটে। এর মধ্যে ৯টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটি চবিতে শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দিয়ে ফতেয়াবাদ স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। অতিরিক্ত রেললাইন না থাকায় ১০টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটির লাইন ক্লিয়ার দিতেই এমনটি করা হয়। এরপর ফতেয়াবাদে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি আবারও চবি স্টেশনে যায়। ফতেয়াবাদ থেকে চবি যেতে ও ইঞ্জিন ঘুরিয়ে আবারও চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসতে অনেক সময় নষ্ট হয়। ট্রেন দুটি চবি থেকে চট্টগ্রামের রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে ফিরতি ছাড়ে ২টা ৩০ এবং ১টা মিনিটে মিনিটে।

এরপর চট্টগ্রাম থেকে আবারও দুপুর ২টা ৫০, ৩টা ৫০ ও রাত ৮টায় ট্রেন চবির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এই ট্রেনগুলো চবিতে পৌঁছায় যথাক্রমে ৩টা ৫০, ৪টা ৫০ এবং রাত ৯টায়। আর চবি থেকে সেগুলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে ৪টা, সাড়ে ৫টা এবং ৯টা ২০ মিনিটে।

সিঙ্গেল রেললাইনে ৪৪ বছর

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীদের জন্য ১৯৮০ সাল থেকে চালু হয় শাটল ট্রেন। কিন্তু ট্রেন চালুর ৪৪ বছর পার হলেও এখনও সিঙ্গেল রেললাইনে আসা-যাওয়া করে ট্রেন। এতবছরে রেললাইনটিও অনেক পুরোনো এবং নড়বড়ে হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সংস্কার করা হলেও তা নামমাত্রই। চবি স্টেশনে স্টেশন মাস্টার নিয়োগ দেওয়া হলেও তা কাগজে কলমেই থেকে গেছে। এখানে শুধুমাত্র দু’জন পয়েন্টসম্যান দায়িত্ব পালন করেন। চবি এই স্টেশনে কোনো স্টেশন ভবনও নেই। একটি রুম থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় ট্রেন চলাচল।

যে কারণে বাড়ছে না শাটল ট্রেন

চবির শাটল ট্রেন চলাচলের রুটটি সিঙ্গেল লাইনের। ফলে একাধিক ট্রেন চলাচল বা সময়সূচি বাড়ানো প্রায় অসম্ভব। যদি এখানে ট্রেন চলাচল ও সময়সূচি বাড়াতে হয় তাহলে লুপ লাইন বাড়াতে হবে। দরকার হবে জনবলেও। এছাড়া চবি স্টেশনে নির্মাণ করতে হবে স্টেশন ভবন। এছাড়া ফতেয়াবাদ স্টেশনে লুপ লাইন বাড়ানো ও ষোলশহর রেলওয় স্টেশনে দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত ৪, ৫, ৬ নম্বর লাইন মাটির নিচ থেকে বের করে সংস্কার করতে হবে।

এছাড়া রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে রয়েছে ইঞ্জিন সংকট রয়েছে।

চবি শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসবী সংগঠন ‘উদ্দীপ্ত বাংলাদেশ’র সভাপতি হাসিবুল খান বলেন, ‘শাটল ট্রেনের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে মারাত্মক বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। আমরা নতুন একটি শাটলের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছি। পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর করা আবেদন উপাচার্য মহোদয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিবেন। আমাদের দাবি হলো, নতুন একটি শাটল চালুসহ ট্রেনের সময়সূচি বাড়ানোর।’

কী বলছেন তারা?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. অহিদুল আলম বলেন, ‘ছয় হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ১৯৮০ সালে একটি শাটল ট্রেন চালু হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের যাতায়াতে খুব অসুবিধা হয়। আরেকটি শাটলের জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছি। যেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে উপাচার্য মহোদয় তুলে দিবেন। গত ২৮ মে আমরা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছি। আশা করি, শিক্ষার্থীরা শাটল ট্রেন পাবেন।’

রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শাটল ট্রেন চালু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চবি উপাচার্য প্রধানমন্ত্রী বরাবরে গণস্বাক্ষর কপি দেবেন। নতুন শাটল চালু করতে কি ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, তা পূর্বাঞ্চলের জিএম ভালো জানবেন। এ বিষয়ে ওনাদের সঙ্গে কথা বলে পদক্ষেপ নেব।’

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ইঞ্জিন সংকট রয়েছে। যদি শাটল ট্রেন বাড়ানোর কথা আসে, সেক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি দেখব। তবে চবিতে শাটল ট্রেন ও সময়সূচি বাড়ানো নিয়ে আমার সঙ্গে কারও কথা হয়নি। চবির কাছ থেকে ৪৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!