দক্ষিণ পতেঙ্গায় নিজের বাসায় কাউন্সিলরের অফিস, এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সেবা পায় না

১০ বছর ধরে বন্ধ চসিকের স্থায়ী কার্যালয়

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ওয়ারিশ সনদ, জন্ম সনদ, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন সেবা পেতে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। গত ১০ বছর ধরে বন্ধ ওয়ার্ডের স্থায়ী কার্যালয়। এরপর পতেঙ্গা সৈকত সড়কের পাশেই একটি অস্থায়ী কার্যালয় করা হলেও ওয়ার্ডের বেশিরভাগ কাজ হয় কাউন্সিলরের বাসায়। যেকোনো ধরনের সেবা নিতে প্রায় সময় যেতে হয় কাউন্সিলরের বাসায়। আর কাউন্সিলরের বাসা ওয়ার্ডের একপ্রান্তে হওয়ায় অনেকে যাতায়াত ঝামেলায়ও পড়েন। এতে এলাকার এক তৃতীয়াংশ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে নাগরিক সুবিধা থেকে। তবে কাউন্সিলরের দাবি, এলাকার মানুষ অস্থায়ী কার্যালয়ে না যাওয়ার কারণেই বাসায় বসে কাজ সারতে হয়।

কাউন্সিলরের বাসার ছোট রুমে বেশি মানুষ হলে বসার সুযোগও থাকে না। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থেকে শালিস-বৈঠক থেকে শুরু করে সব কাজ শেষ করতে হয়।
কাউন্সিলরের বাসার ছোট রুমে বেশি মানুষ হলে বসার সুযোগও থাকে না। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থেকে শালিস-বৈঠক থেকে শুরু করে সব কাজ শেষ করতে হয়।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে স্থায়ী কার্যালয় সংস্কার করে প্রয়োজনে টিনশেডের একটি ঘর বানিয়ে হলেও ওয়ার্ডের কার্যক্রম চালুর দাবি জানান স্থানীয়রা।

জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ পতেঙ্গা ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের মাইজপাড়া বটতলায় সিটি কর্পোরেশনের স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য সাবেক চেয়ারম্যান ডা. মো. আইয়ুব আলী আট শতক জায়গা দান করেন। এরপর ওখানে কার্যালয় নির্মাণ করে কার্যক্রম চললেও গত ১০ বছর ধরে এটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে। ডা. মো. আইয়ুব আলীর পর দায়িত্ব পালন করেছেন মো. কাদের, মো. ইসমাইল, নুরুল আবছার এবং সর্বশেষ করছেন ছালেহ আহম্মেদ চৌধুরী।

দক্ষিণ পতেঙ্গা মাইজপাড়ার ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী কার্যালয়টি পড়ে আছে অবহেলা আর অযত্নে।
দক্ষিণ পতেঙ্গা মাইজপাড়ার ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী কার্যালয়টি পড়ে আছে অবহেলা আর অযত্নে।
Yakub Group

শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, দক্ষিণ পতেঙ্গা মাইজপাড়ার ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী কার্যালয়টি পড়ে আছে অবহেলা আর অযত্নে। চারদিক থেকে যাতায়াতের সুবিধা থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সময়ে সেবা পেতেন এখানে।

পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় সী বিচ রোডে এসএপিএল কন্টেইনার ডিপো সংলগ্ন সড়কের পশ্চিম পাশে কাউন্সিলরের অস্থায়ী কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, লোকজন নেই কার্যালয়ে। চেয়ার নিয়ে বসে আছেন দায়িত্বে থাকা মধ্যবয়স্ক এক লোক। সিটি কর্পোরেশনের সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, জন্ম নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট সবকিছু কমিশনারের বাসায় হয়। এখানে কিছুই পাবেন না।

এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, জন্ম সনদ ও ওয়ারিশ সনদের জন্য মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। ২০০ থেকে ৩০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে কাউন্সিলর ছালেহ আহম্মেদ চৌধুরীর বাসভবনে গিয়ে নিতে হয় এসব সেবা। কাউন্সিলরের বাসার ছোট রুমে বেশি মানুষ হলে বসার সুযোগও থাকে না। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থেকে শালিস-বৈঠক থেকে শুরু করে সব কাজ শেষ করতে হয়।

নির্বাচনের আগে কাউন্সিলরের ছেলে দিদার চৌধুরী এলাকাবাসীকে ওয়াদা করে বলেছিলেন, তার বাবা নির্বাচনে জয়ী হলে ১০ লাখ টাকা অনুদান দেবেন স্থায়ী কার্যালয়ের উন্নয়নের জন্য। নির্বাচনও হলো, জয়ী হলেন—কিন্তু আশার বাণী সবই মিছে। এ বিষয়ে দু’মাস আগে সিটি মেয়রকে জানালে তিনি চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে খোঁজখবর নিতে বলেন এবং উন্নয়নের আশ্বাস দেন।

মাইজপাড়া, চৌধুরীপাড়া, হিন্দুপাড়া, নাজিরপাড়া, ডেইলপাড়ার, চরপাড়া ও ফুলছড়ি পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এখান থেকে কাউন্সিলরের বাসায় যেতে আমাদের গাড়ি ভাড়া গুনতে হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অনেক সময় কাউন্সিলরের বাসায় গিয়েও দেখা মেলে না। স্থায়ী কার্যালয়ের জায়গা থাকার পরও ৮-১০ বছর ধরে কেন সী বিচ রোডে অস্থায়ী কার্যালয় এবং পরে নিজের বাসভবনকে কার্যালয় বানালেন কাউন্সিলর? স্থায়ী কার্যালয়ের উন্নয়ন ও সংস্কারের বিষয়ে বর্তমান কাউন্সিলরের আন্তরিকতার বড়ই অভাব।

শাহাজান নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘কাউন্সিলর ছালেহ আহম্মেদ চৌধুরী মাইজপাড়ার কার্যালয়কে এখন গোয়াল ঘর বানিয়ে রেখেছেন। নিজের বাসাকে কার্যালয় বানিয়ে পরিবারতন্ত্র কায়েম করছেন। নির্বাচনে ওনার পক্ষে যারা কাজ করেনি তাদের জঘণ্য ব্যবহার ও হয়রানি করেন। আমি গত এক মাস ঘুরে জন্ম নিবন্ধন সনদ পেয়েছি।’

স্থায়ী বাসিন্দা মো. কাশেম বলেন, ‘আমরা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এখন দরিদ্র মানুষগুলো আর ২০ টাকা দিয়ে চিকিৎসা সেবা পায় না। এলাকার বিভিন্ন স্থানে রাতে বাতি জ্বলে না। নিয়মিত খালের ড্রেজিং না করায় জলাবদ্ধতা হয়। যেকোনো সনদ নিতে কমিশনারের বাসায় যেতে অনেক টাকা গাড়ি ভাড়াও দিতে হয়। আপাতত সেমিপাকা বা একতলা করে হলেও স্থায়ী কার্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে কাউন্সিলরকে বলা হয়েছিল। তিনি মেয়রের সঙ্গে কথা বলে এখানে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হবে বলে জানান।’

চরপাড়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আলী আক্কাস বলেন, ‘কাউন্সিলরের সাইনবোর্ড কাজে লাগিয়ে এখন রাজত্ব করছেন তার ছেলে ওয়াহিদ আলম চৌধুরী। সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে। কাউন্সিলর ও তার ছেলেকে যারা টাকা এনে দিতে পারবেন তাদেরই দাম বেশি। এভাবেই চলছে বাপ-ছেলের রাজত্ব।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছালেহ আহম্মেদ চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত মেয়াদে আমি প্ল্যান পাশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। বরাদ্দ না থাকায় মেয়র ঢাকা থেকে প্ল্যান পাশ করানোর চেষ্টা করছেন। কার্যালয়টি ছয়তলা ফাউন্ডেশনের হবে। এ জায়গা খতিয়ানভুক্ত। শনিবার সবার অফিস বন্ধ থাকলেও আমার অফিস ৪টা পর্যন্ত খোলা ছিল।’

সিটি কর্পোরেশনের পর্যটন কেন্দ্রের জায়গায় অস্থায়ী কার্যালয় আর কতদিন থাকবে—এ প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমি চারবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং তিনবারের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। আমার আমলে প্রায় ২০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে। অলিগলির সব রাস্তা আমিই পাকা করেছি। এলাকার উন্নয়নে আমি খুব আন্তরিক।’

সেবা নিতে আসা জনগণের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয় কিনা— জানতে চাইলে কাউন্সিলর বলেন, ‘আমি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি।’

একপর্যায়ে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার বাড়ি নিশ্চয় চট্টগ্রাম, কেউ আনছে আপানাকে রিপোর্ট করানোর জন্য। গত নির্বাচনেও অনেক মহল আমাকে পরাজিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, তাতে কোনো লাভ হয়নি। আমাকে নিয়ে একটি মহল খেলতেছে। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারিসহ একটি মহল আমার পেছনে ওঠে-পরে লেগেছে। জনগণ আমার সঙ্গে আছে, কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm