তেলের নজিরবিহীন সংকটে বসে আছে বিদেশি জাহাজ, ভোগ্যপণ্য ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয়ের শঙ্কা

বিপিসি তেল দিচ্ছে না, মজুতদারিতে অনেক ডিলার

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বসে আছে একের পর এক বিদেশি জাহাজ, কিন্তু জ্বালানি নেই। মেরিন ফুয়েল বা সামুদ্রিক জ্বালানির নজিরবিহীন সংকটে কার্যত থমকে গেছে বাঙ্কারিং কার্যক্রম। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পাওয়া এবং ডিলারদের একাংশের মজুদ করার অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর জের ধরে ভোগ্যপণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘নো বাঙ্কারিং পোর্ট’ হিসেবে বিবেচনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বন্দরের মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি শুল্ক ও পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থায় জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ সুবিধাকে বাঙ্কারিং বলা হয়।

বিপিসির সরবরাহ সংকট, ডিলারদের বিরুদ্ধে মজুদের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী মাদার ভেসেলগুলো ০.৫ সালফারযুক্ত বিশেষায়িত মেরিন ফুয়েল ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে চলতি মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুরে এই তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কয়েকজন ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত মেরিন ফুয়েল থাকলেও তারা তা বাজারে ছাড়ছে না, বরং মজুদ করছে। অন্যদিকে কিছু তেল বিদেশি জাহাজে সরবরাহ করা হলেও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বিদেশি জাহাজে সরবরাহের জন্য গত কয়েক দিন ধরে ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পয়েন্ট ফাইভ সালফার মেরিন ফুয়েল পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

তবে ডিলারদের দাবি, পে-অর্ডার করার পরও বিপিসি থেকে তারা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। এক লাখ লিটারের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার লিটার। ফলে বিদেশি জাহাজগুলোতেও চাহিদামতো জ্বালানি দেওয়া যাচ্ছে না।

অনেক ডিলার তেল মজুত করছেন – এমন অভিযোগ অস্বীকার করে চট্টগ্রামভিত্তিক মেরিন ফুয়েল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এআর কর্পোরেশনের স্বত্ত্বাধিকারী আবদুর রাজ্জাক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ সত্য নয়। যেখানে তেলই পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে মজুত করার তো প্রশ্নই আসে না। আসল কথা হচ্ছে, সারা বিশ্বেই তেলের সংকট চলছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।’

চট্টগ্রাম বন্দরে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের অনুমোদন রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে তেল সংগ্রহ করে মেরিন অয়েল ডিলাররা ট্যাংকারের মাধ্যমে বিদেশি জাহাজে সরবরাহ করেন। মেরিন ফুয়েলের প্রধান ডিলারদের মধ্যে রয়েছে বিসমিল্লাহ অয়েল সাপ্লাইয়ার্স, এআর কর্পোরেশন, যমুনা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং, এএম এন্টারপ্রাইজ, শাহ আমানত মেরিন সার্ভিস, সী গ্রীন এন্টারপ্রাইজ, জ্যোতি অয়েল কোং, আল নুর কর্পোরেশন, এএম এন্টারপ্রাইজ, কাজী এন্টারপ্রাইজ, এনার্জি নেভিগেশন, কর্ণফুলী বাঙ্কার সাপ্লায়ার্স, শাহ আমানত অটোমোবাইলস, জহুরা কর্পোরেশন, আবরার মেরিন সার্ভিস, ভিশন কর্পোরেশন, রয়েল ট্রেডার্স এবং এ পেইস মেরিন এন্ড ফুয়েল সার্ভিস।

এদিকে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী লাইটার জাহাজের মালিকরাও চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না, ফলে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ডিলাররা সাধারণত মাদার ভেসেল থেকে পয়েন্ট ফাইভ সালফার মেরিন ফুয়েল সংগ্রহ করে থাকেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তারা স্থানীয় বাজারের ওপরই বেশি নির্ভর করছেন।

অন্যদিকে বিপিসি সূত্র দাবি করছে, ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ীই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এখনও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। পাশাপাশি দেশেই মেরিন অয়েল উৎপাদনের প্রযুক্তি তাদের হাতে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সিঙ্গাপুরে দাম বাড়ায় দেশীয় ডিলাররাও ইদানিংকালে অতিরিক্ত চাহিদাপত্র দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ বিপিসির।

ভোগ্যপণ্যে অস্থিরতার আভাস

এদিকে জ্বালানির এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে পণ্য গন্তব্যে না পৌঁছালে ঈদের পর বাজারে ঘাটতি তৈরি হবে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে চাপ

বিদ্যুৎ খাতেও এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী বিদেশি জাহাজ বন্দরে এসে বসে আছে, কিন্তু তেলের অভাবে জাহাজ পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় সেই কয়লা খালাস করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।’

লাইটার জাহাজে জ্বালানি সংকট, থমকে অভ্যন্তরীণ পরিবহন

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন নদীবন্দর ও ঘাটে পৌঁছে দেয় প্রায় এক হাজার ১০০ লাইটার জাহাজ। প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০টি জাহাজ পণ্য খালাসের শিডিউল পায়। এসব জাহাজের জন্য প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার লিটার। একটি লাইটার জাহাজের চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতে যেখানে চার হাজার লিটার তেল প্রয়োজন, সেখানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ লিটার। ফলে জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করতে পারছে না, নোঙরেই পড়ে থাকছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের এমন সংকট আগে কখনও দেখা যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের অন্তত ৮০ শতাংশই লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়, যার বড় অংশই ভোগ্যপণ্য। কিন্তু এখন চাহিদার ছয়ভাগের একভাগ তেলও সরবরাহ করা হচ্ছে না। প্রতি মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার টন মেরিন ফুয়েলের চাহিদা থাকলেও তা পূরণ হচ্ছে না।

বন্দরে আটকে কার্গো, সতর্কবার্তা ব্যবসায়ীদের

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আহ্বায়ক শফিক আহমেদ এনার্জি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছেন, কার্গোবাহী অনেক লাইটার জাহাজ কর্ণফুলী নদীতে আটকা পড়ে আছে। জ্বালানির অভাবে তারা বহির্নোঙরে যেতে বা গন্তব্যে রওনা দিতে পারছে না। সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের আউটার নোঙরে ৭০টির বেশি মাদার ভেসেল আমদানি পণ্য নিয়ে অপেক্ষা করছে। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি লাইটার জাহাজ পরিচালনা করতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ লিটার জ্বালানি।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান বিপিসিকে দেওয়া চিঠিতে সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি ঘাটতি অব্যাহত থাকলে রপ্তানি, আমদানি ও বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে গুরুতর ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

ksrm