তাপদাহে দিশেহারা চট্টগ্রাম, দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে হিটস্ট্রোক, ভিড় বাড়ছে মেডিকেলে

হিটস্ট্রোককে সাধারণ জ্বর ভেবে কালক্ষেপণ করা যাবে না

চট্টগ্রামে তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। আবহাওয়ার এমন আচরণে জ্বর, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রকম অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। তবে এরমধ্যে নতুন করে দেখা দিয়েছে হিটস্ট্রোক। মূলত জ্বরে আক্রান্ত রোগীরাই এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। শরীরের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এতে সবাই এটিকে ভাইরাল ফিভার মনে করে ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা পেতেও দেরী হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হচ্ছে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী ও ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের। কিন্তু যথাসময়ে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অভাবে রোগী অবস্থার অবনতি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট অতিক্রম করলেও সেটিকে ‘ভাইরাল ফিভার’ বলে মনে করে প্যারাসিটামল খাচ্ছেন রোগীরা। তবে হিটস্ট্রোকের জ্বরে ঘাম থাকবে না। সাধারণ জ্বর ৬ ঘণ্টা পর কমে যাবে, তবে হিটস্ট্রোকের ক্ষেত্রে সেটি হবে না। তাই জ্বরের অবস্থা দেখে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

জানা গেছে, হিটস্ট্রোকের আগে অপেক্ষাকৃত কম মারাত্মক হিট ক্র্যাম্প অথবা হিট এক্সহসশন হতে পারে। হিট ক্র্যাম্পে শরীরের মাংসপেশিতে ব্যথা হয়, শরীর দুর্বল লাগে এবং প্রচণ্ড পিপাসা পায়। এর পরের ধাপে হিট এক্সহসশনে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, মাথাব্যথা, ঝিমঝিম করা, বমিভাব, অসংলগ্ন আচরণ দেখা দেয়। এই দুই ক্ষেত্রেই শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ঠিক থাকে এবং শরীর অত্যন্ত ঘামতে থাকে। এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে হিটস্ট্রোক হতে পারে। এই সময় শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যাবে। ঘাম বন্ধ হয়ে যাবে, ত্বক শুষ্ক ও লালচে হয়ে যাবে, নিশ্বাস দ্রুত হবে। নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ ও দ্রুত হবে, রক্তচাপ কমে যাবে, খিঁচুনি, মাথা ঝিমঝিম করা, অস্বাভাবিক আচরণ, হ্যালুসিনেশন, অসংলগ্নতাসহ প্রসাবের পরিমাণ কমে যাবে। রোগী শকে চলে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন বহির্বিভাগের রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান (আরপি) ডা. মো. শাহেদ উদ্দিন বলেন, ‘সারাদেশের মত চট্টগ্রামেও তীব্র তাপদাহে দিশেহারা মানুষ। জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। হাসপাতালে বাড়ছে ভীড়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন বহির্বিভাগে জ্বরের রোগী বাড়ছে। কিন্তু সেই জ্বরের রোগী ‘ভাইরাল ফিভার’ ভেবে বাড়িতে কালক্ষেপণ করে হাসপাতালে আসছেন।’

তিনি বলেন, ‘জ্বরের যেসব রোগী আসছে, সেসব রোগীদের কেউ কেউ হিটস্ট্রোক করে ফেলেছেন। স্ট্রোকের অন্যান্য লক্ষণ অনেক সময় পুরোটা প্রকাশিত হয় না। কিন্তু কিছু বিষয় দেখে রোগীর হিটস্ট্রোক হয়েছে কি-না তা বোঝা যেতে পারে। কিন্তু জ্বরের রোগীর ভীড়ে আমরাও ডায়াগনোসিসের ওপর নির্ভর করে রোগীকে সাধারণ জ্বরের রোগী ভেবে ওয়ার্ডে ভর্তি দিয়ে দিচ্ছি। এতে রোগীর সুচিকিৎসা হচ্ছে না।’

এদিকে রোববার (৭ মে) চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন ওয়ার্ডে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে হিটস্ট্রোকের রোগী আসার পর তাদের ডায়াগনোসিস না করে ১৩, ১৪, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই জ্বর ‘ভাইরাল ফিভার’ নাকি হিটস্ট্রোক হয়েছে, তা জানতে ডায়াগনোসিস করতেই পুরো দেড় থেকে দু’দিন চলে যাচ্ছে। এমন অনেক রোগীর দেখা মিলেছে তিন ওয়ার্ডে।

এছাড়া রোগীর শরীর থেকে লবণ বের হয়ে গেলেও তা জানতে ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা করাতেও দেরী হচ্ছে। ফলে রোগীর অবস্থা অবনতি হয়ে শকে চলে যাচ্ছে।

ওয়ার্ডের তেমনই এক রোগী সাহাবুদ্দিন তালুকদার। সীতাকুণ্ডের কুমিরা থেকে আনা হয়েছে তাকে। জমিতে কাজ করে দুপুরে বাসায় ফেরার পর জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছিল, কথাও অস্পষ্ট হয়ে যায়। পরে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয় তাকে। গত শনিবার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। ডাক্তার টেস্ট করতে দিলে সবগুলোর রেজাল্ট এখনো পাওয়া যায়নি। দু’দিন ধরে সাহাবুদ্দিনকে শুধু স্যালাইন পুশ করা হচ্ছে বলে জানান তার ছোট ভাই শরীফ।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের জ্বর ও পানিশূন্যতা নিয়ে একটা ঘাপলা থাকে। সেটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। সাধারণ কিছু নির্ণায়কও থাকে। যা আমরা ডায়াগনোসিস রিপোর্ট দেখেই নিশ্চিত হতে পারি।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!