ঢাকার মামলার নামে চট্টগ্রামে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: মামলা দস্যুতার, ওয়ারেন্ট খুনের
সিল-স্বাক্ষর সব নকল, এক পাতায় অতীত-ভবিষ্যতের তারিখ
ঢাকার ধানমন্ডি থানার একটি কথিত ‘হত্যা মামলার’ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঘিরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য। পরোয়ানায় অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে কর্ণফুলীর চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল করিমের নাম। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় একের পর এক অসঙ্গতি রয়েছে এবং সেটি ভুয়া হওয়ার জোরালো আলামত মিলছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ ডিসেম্বর। সেদিন কর্ণফুলী থানার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে রেজাউল করিম জানতে পারেন, তাঁর নামে ঢাকার ধানমন্ডি থানার একটি হত্যা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসেছে। পরে জানা যায়, ওই ওয়ারেন্টটি গত ১১ অক্টোবর সিএমপি এডিসি (প্রসিকিউশন) দপ্তরে গ্রহণ করা হয়।
খবর পেয়ে রেজাউল করিম কর্ণফুলী থানা থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার একটি ছায়াকপি সংগ্রহ করেন। এরপর সেটি নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম আদালত ভবনের প্রসিকিউশন বিভাগে দায়িত্বরত এক গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রাথমিকভাবে ওই কর্মকর্তা জানান, নথিটি পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ঢাকার আদালত থেকে এসেছে। তখন রেজাউল করিম স্পষ্টভাবে জানান, তিনি কখনো ঢাকায় বসবাস করেননি এবং কোনো হত্যা মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ভুক্তভোগীর বক্তব্যের পর নথিটি পুনরায় খতিয়ে দেখতে গিয়ে গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড অফিসার নিজেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় একাধিক অসঙ্গতি দেখতে পান। বিষয়টি জানানো হলে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন নথিটি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেন।
আইনজীবী আনোয়ার হোসেন জানান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার একই পাতায় একাধিক পরস্পরবিরোধী তারিখ রয়েছে, যেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ তারিখ একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, একটি বিচারিক ওয়ারেন্ট নির্দিষ্ট এক তারিখে জারি হয়; একই নথিতে একাধিক সাংঘর্ষিক তারিখ থাকা মানেই সেটি সন্দেহজনক। তিনি আরও বলেন, মামলার নম্বর এবং জিআর বা সিআর রেফারেন্সে কোনো স্বচ্ছতা নেই। কোথাও হাতে লেখা, কোথাও কেটে সংশোধন, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ নম্বর রয়েছে, যা বিচারিক নথির মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় ব্যবহৃত সিল ও স্বাক্ষর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একাধিক সিল একটির ওপর আরেকটি চাপানো হয়েছে, কিছু সিলের লেখা অস্পষ্ট, স্বাক্ষরের সঙ্গে সিলের অ্যালাইনমেন্ট নেই। আদেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম, পদবি ও আদালতের পরিচয়ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। নথির ফরম্যাটেও গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের কালি, ভিন্ন হাতের লেখা, লাইনের বাইরে লেখা এবং অতিরিক্ত হাতে লেখা সংযোজন মিলিয়ে এটি কোনো নির্ধারিত আদালত ফরম্যাটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় মোট ছয়টি সিল দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ঢাকা, পুলিশ সুপারের কার্যালয় চট্টগ্রাম, ধানমন্ডি জিআর শাখা, প্রসিকিউশন বিভাগ ঢাকা এবং এডিসি প্রসিকিউশন সিএমপি। একটি গোল সিলের লেখা উল্টো ও অস্পষ্ট বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।
পরোয়ানায় ধানমন্ডি থানার মামলা নম্বর ৩(১১)২৪ উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। গত ১৮ ডিসেম্বর ভুক্তভোগীর পরিবার ঢাকায় গিয়ে ধানমন্ডি থানা থেকে মামলার এজাহার সংগ্রহ করে। সেখানে দেখা যায়, মামলাটি হত্যা নয়, দস্যুতা সংক্রান্ত, যা দণ্ডবিধির ৩৯৩ ধারায় দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী র্যাব-২-এর এসআই অনিল জীবন চাকমা। এজাহারে চারজন আসামির নাম রয়েছে, যাদের কেউই রেজাউল করিম নন।
ধানমন্ডি থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ শরীফ নিশ্চিত করে বলেন, এই মামলায় চট্টগ্রামের কোনো ব্যক্তি আসামি নয় এবং চার্জশিটেও এমন কোনো নাম নেই। ধানমন্ডি থানার দায়িত্বে থাকা আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের জিআরও এসআই মোহাম্মদ বাশারও জানান, রেজাউল করিম নামের কেউ এ মামলার আসামি নন। এজাহার কিংবা চার্জশিটে এমন কোনো নাম নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, পূর্ববর্তী মামলার পরিসংখ্যান যাচাই করেও রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে কোনো হত্যা মামলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
রেজাউল করিম অভিযোগ করেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্র তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হয়রানি করছে। তাঁর দাবি, পরিকল্পিতভাবে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তৈরি করে তাঁকে হত্যা মামলার আসামি বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
কর্ণফুলী থানার ওসি মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তিনি এক গণমাধ্যমকর্মীর মাধ্যমে জানতে পেরেছেন এবং ওয়ারেন্ট অফিসারকে যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মাধ্যমে হয়রানি নতুন নয়। ২০২০ সালে হাইকোর্ট এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না। সিনিয়র আইনজীবী মাহমুদুল হক বলেন, আদালতের নাম ও সিল ব্যবহার করে জাল নথি তৈরি বিচার ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি।
জেজে/সিপি




