টাকা ছাড়া কিছুই হয় না হাটহাজারীর এক সরকারি স্কুলে, যতো অভিযোগ প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধেই (ভিডিও)

0

বই নিতে টাকা, ভর্তি হতে টাকা, টিসি নিতে টাকা, পাশ করতে টাকা, এমনকি টাকার বিনিময়ে লেনদেন হয় প্রত্যয়নপত্রও। প্রথমে শুনে মনে হতে পারে এটি কোনো দোকানের চিত্র। তবে চিত্রটি হচ্ছে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।

হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ মাদার্শা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন খানমের বিরুদ্ধে পাহাড়সম অনিয়মের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকরা। নিজের সন্তানকে কম খরচে পড়ানোর জন্য সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে গেলেও গুণতে হচ্ছে বেসরকারি স্কুলের মতোই মোটা অংকের টাকা। এছাড়াও প্রধান শিক্ষিকা নামে-বেনামে নানান খাত দেখিয়ে আদায় করছেন অতিরিক্ত টাকা— এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী অভিভাবকদের।

শুধু তাই নয়, প্রধান শিক্ষিকার এসব অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করার পর স্কুলের পার্শ্ববর্তী বড়ুয়াপাড়া ও জেলেপাড়ার শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ মিলেছে।

তবে এই দুই গ্রামের বাচ্চাদের ভর্তি না করানোর ব্যাপারে প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন খানম দাবি করেন, ‘ওই দুটি গ্রাম স্কুলের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার (জরিপের সুবিধার্থে পার্শ্ববর্তী দুই স্কুলের এরিয়া) বাইরে পড়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ১০% ছাত্র ভর্তির আদেশ আছে, তাই ওই গ্রামের বাচ্চাদের পরে ভর্তি করাবো।’

তবে ইয়াসমিন খানমের এই যুক্তিকে মিথ্যা দাবি করে ওই স্কুলের একাধিক শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন, এরকম কোনো আদেশ নেই। ছাত্রদের সুবিধার্থে যে স্কুলে পড়তে মন চাইবে, তারা সেই স্কুলেই পড়তে পারবে যদি স্কুলে সিট খালি থাকে। স্কুলে পর্যাপ্ত পরিমাণ সিট খালি আছে, তারপরও প্রধান শিক্ষিকা ইচ্ছাকৃতভাবে গরিব অভিভাবকদের হয়রানি করছেন।

জানা গেছে, ২০২১ সালে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন খানমের বিরুদ্ধে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও উপজেলা শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগ করেন এক অভিভাবক। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি আসলে বড়ুয়াপাড়া ও জেলেপাড়ার ছাত্র ও অভিভাবকরা প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেন। এর প্রতিশোধস্বরূপ এই বছর এই দুই গ্রামের ছাত্রদের ঠুনকো অজুহাতে ভর্তি করাচ্ছেন না প্রধান শিক্ষিকা। এমনকি তিনি স্কুলে উপস্থিত না থাকলে সেই দিন স্কুলে কোনো ধরনের ভর্তি কার্যক্রম না করার ও নির্দেশ দেওয়া হয় স্কুলের বাকি শিক্ষকদের।

ইয়াসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তদন্তের ব্যাপারে তৎকালীন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এমএ মজিদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় অনেক অভিভাবক আমার কাছে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসেন। প্রাথমিক অবস্থায় ছোটখাটো বিষয়গুলো আমি সমাধান করলেও বড় বিষয়গুলোর ব্যাপারে আমি তাদের শিক্ষা অফিসে দরখাস্ত করতে বলি। সেই অভিযোগের পর শিক্ষা অফিস থেকে তদন্ত করা হয় এবং অভিযুক্ত শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া যায়।

সরকার থেকে বিনামূল্যে বই দিলেও মাদার্শার এই স্কুলে সরকারি বই নিতে গুণতে হয় হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ভর্তি বাতিলেরও হুমকি দেওয়া হয়। এরকম একটি ভিডিও হাতে এসেছে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের কাছে।

সেই ভিডিওটিতে দেখা যায়, বই দেওয়ার পরিবর্তে এক অভিভাবকের কাছ থেকে টাকা দাবি করছেন প্রধান শিক্ষিকা। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অভিভাবকদের সাথে খারাপ আচরণ ও ভর্তি বাতিলেরও হুমকি দিতে দেখা যায় ভিডিওটিতে। চার জায়গায় নাম এন্ট্রি করতে হবে এবং বই আনতে আসা-যাওয়ার খরচ তুলতেই এক্সট্রা টাকা দাবি করা হচ্ছে— এমন যুক্তিও দিতে দেখা যায় প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিনকে।

তবে ভিডিওটি ‘নকল’ ও ‘মিথ্যা’ দাবি করে অভিযুক্ত শিক্ষিকা ইয়াসমিন বলেন, ‘ওরা খুব ক্রিয়েটিভ। ওরা এগুলো সৃষ্টি করছে। এগুলো সব ভুয়া।’

তবে ইয়াসমিনের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘ওই শিক্ষিকার কাজই এমন— ধরা খেলে সব মিথ্যা হয়ে যায়। আমার মনে হয় তিনি দুর্নীতিতে মাস্টার্স পাশ করেছেন। প্রতিটা পদে পদে টাকা চাওয়া ওনার নেশা।’

তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে অন্য স্কুলে ভর্তির জন্য প্রথমে প্রত্যয়নপত্র নিতে গেলে তিনি প্রথমে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে অনেক অনুরোধের পর দুদিন পরে সেটা দেন। কিন্তু যখন আমি ছেলেকে ভর্তি করানোর পর মাদার্শা স্কুল থেকে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) নিতে যাই, তখন ইয়াসমিন ম্যাডাম বলেন প্রত্যয়নপত্র ও টিসি একই। পরে অনেক অনুরোধের পর ছেলের ভর্তির শেষ তারিখে টিসি দেন। তিনি ইচ্ছা করেই আমাকে হয়রানি করিয়েছে।’

এই হয়রানির পেছনের কারণ হিসেবে ওই অভিভাবক বলেন, ‘স্কুলের এক শিক্ষকের কাছে আমার ছেলে প্রাইভেট পড়ে। সেই শিক্ষক হচ্ছেন এই ম্যাডামের অপছন্দের। তাই সেই অপরাধে আমাকে হয়রানি করলেন।’

শুধু ছাত্র বা অভিভাবক নন, প্রধান শিক্ষিকার কথা অমান্য করলে বা প্রতিবাদ করলে বিপদে পড়তে হয় খোদ শিক্ষকদেরও। কেউ প্রতিবাদ করলেও সেই শিক্ষকদের পড়তে হয় রেড লিস্টে। ইয়াসমিনের মানসিক অত্যাচারে স্কুলের দুই শিক্ষক ট্রান্সফার নিয়ে অন্য স্কুলে চলে যেতেও বাধ্য হন এবং আরও দুই শিক্ষক ট্রান্সফার হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্চ্ছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়াও,করোনাকালে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিএসসি পরীক্ষার পরিবর্তে কোনো ধরনের ফি না নেওয়া হলেও শুধুমাত্র এই মাদার্শা স্কুলে পিএসসি পরীক্ষার ফি নেওয়া হয় বাধ্যতামূলকভাবে। এছাড়া কোনো বাচ্চা যদি বেসরকারি কিন্ডারগার্ডেন স্কুল থেকে এই স্কুলে ভর্তি হতে আসে, তখন তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অতিরিক্ত টাকার বোঝা।

এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানালেও পরবর্তীতে তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তদন্ত হয়েছে এবং সেটা জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা লতিকা জাহান। তবে তদন্ত চলাকালে তিনি এই কর্মস্থলে না থাকায় ঠিক কী কী বিষয়ে ও অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হয়েছে তা বলতে পারেননি।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm