জুলাইয়ের মামলায় মিলছে না হিসাব, বিদেশে থেকেও অনেকে আসামি, গুলি চালিয়েও বাদ পুলিশ!

হলফনামা এক কথা বলছে, এজাহার আরেক

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামে দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর নথি বিশ্লেষণে একের পর এক অসংগতি উঠে এসেছে। কোনো কোনো মামলায় ঘটনার সময় বিদেশে থাকা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, আবার একাধিক বাদি আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন, তাদের অজান্তেই এজাহারে কিছু ব্যক্তির নাম যুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় প্রকাশ্যে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম চূড়ান্ত আসামির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচারপ্রক্রিয়াকে ঘিরে এসব প্রশ্ন নতুন করে ন্যায়বিচার নিয়েই বিতর্ক তৈরি করেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেই আন্দোলনে নিহতদের ঘটনায় চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যা মামলা এবং পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হলেও, তদন্ত ও অভিযোগপত্রের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন। চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মামলাগুলোর এমন কিছু অসংগতি, যা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

১৬ জুলাইয়ের সংঘর্ষ ও তিন মৃত্যু

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মোড় ঘুরে যায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। আগের দিন ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সেদিন চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর এলাকায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মী ও পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। ইট-পাটকেলের পাশাপাশি ছোড়া হয় রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ অসংখ্য মানুষ আহত হন। আহতদের চাপে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতি হয়ে ওঠে সংকটপূর্ণ।

সেদিন চিকিৎসকেরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। তারা হলেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরাম, ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মো. ওমর ফারুক এবং ওমরগণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ফয়সাল আহমেদ শান্ত।

প্রথম মামলা, হাজারো অজ্ঞাত আসামি

সংঘর্ষের পরদিন, ১৭ জুলাই পাঁচলাইশ থানার তৎকালীন উপ-পুলিশ পরিদর্শক দীপন দেওয়ান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলাটির নম্বর ১৭(৭)২৪ এবং জিআর নম্বর ১৭২/২৪।

আন্দোলন চলাকালে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কিন্তু তদন্ত শেষে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র না দিয়ে চলতি বছরের ২৮ জুন চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক এমএ সুফিয়ান কুতুবী।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একই ঘটনায় নিহত তিনজনের পরিবারের পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও অভিযোগ করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগপত্রের পরিবর্তে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।

কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি মামলার বিস্তার। বরং এরপরই শুরু হয় নিহতদের পরিবারের পৃথক হত্যা মামলা।

নিহতদের পরিবারের পৃথক তিন মামলা

দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ওয়াসিম আকরামের মা জোসনা বেগম পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০৮ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলাটির নম্বর ১৮(৮)২৪।

এর ১০ দিন পর, ওই বছরের ২৮ আগস্ট ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মো. ওমর ফারুকের বাবা মো. দুলাল একই থানায় আরেকটি হত্যা মামলা করেন। এতে ২৬৯ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার জিআর নম্বর ২১২/২৪।

অন্যদিকে, ফয়সাল আহমেদ শান্ত নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর পাঁচলাইশ থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহবুবুল হাছান হত্যা মামলা করেন। এতে ৯৯ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরও এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলাটির নম্বর ৯(১২)২৪।

এই তিনটি হত্যা মামলার সার্বিক বিশ্লেষণে একের পর এক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আইনজ্ঞদের মতে, দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া জরুরি।

বিদেশে থেকেও হত্যা মামলার আসামি

পাঁচলাইশ থানায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আরও কিছু অসংগতি সামনে আসে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওয়াসিম আকরাম, মো. ওমর ফারুক ও ফয়সাল আহমেদ শান্ত হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরের জামালখান ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনকে। একই সঙ্গে ওয়াসিম ও শান্ত হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুকেও।

তিনটি হত্যাকাণ্ডই ঘটে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ওই সময় দুজনের কেউই দেশে ছিলেন না। শৈবাল দাশ সুমন ৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত দেশের বাইরে ছিলেন। একইভাবে মহিউদ্দিন বাচ্চু ১৩ জুলাই দেশ ছেড়ে ২৫ জুলাই ফেরেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনার দিন দেশে না থেকেও তারা কিভাবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিলেন। বিদেশে অবস্থান করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকলে ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় তাদের আসামি করার ভিত্তি কী, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বাদির হলফনামায় নতুন প্রশ্ন

মামলাগুলো ঘিরে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে, যখন একাধিক বাদিই দাবি করেছেন, তাদের অজান্তে এজাহারে কিছু ব্যক্তির নাম যুক্ত করা হয়েছে।

মো. ওমর ফারুক হত্যা মামলায় বাদী তার বাবা মো. দুলাল। তার করা মামলার ৫ নম্বর আসামি করা হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে।

কিন্তু মো. দুলাল জানিয়েছেন, মামলা দায়েরের সময় তিনি আ জ ম নাছির উদ্দিনের নাম দেননি। তার ভাষ্য, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কেউ একজন সাবেক এই মেয়রের নাম মামলায় যুক্ত করেছেন।

মো. দুলাল বলেন, ছেলের মৃত্যুর পরদিনই আ জ ম নাছির উদ্দিন তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমবেদনা জানিয়েছিলেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরে মামলায় তার নাম দেখে তিনি নিজেকেই ‘অপরাধী’ মনে করেন।

এসব বিষয় উল্লেখ করে আ জ ম নাছির উদ্দিনকে জামিন বা মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানিয়ে আদালতে হলফনামাও দেন মো. দুলাল।

শান্ত হত্যা মামলার বাদি নিয়ে বিতর্ক

ফয়সাল আহমেদ শান্ত হত্যা মামলাও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত এ ধরনের মামলায় নিহতের বাবা-মা বা নিকটাত্মীয় বাদি হন। কিন্তু এই মামলায় বাদি হয়েছেন পাঁচলাইশ থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহবুবুল হাছান।

শান্তর বাবা-মায়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলের একজন নেতার বাদি হওয়ার বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এভাবে মামলা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

১৮ জুলাই: আবার সংঘর্ষ, আবার প্রাণহানি

২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার দুই দিন পর, ১৮ জুলাই আন্দোলন আরও সহিংস রূপ নেয়। সেদিন সারাদেশে আন্দোলনকারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছিল। সকাল থেকেই চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। দুপুরের দিকে বহদ্দারহাট মোড়ে বিক্ষোভ শুরু হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

সংঘর্ষে তানভীর সিদ্দিকী ও সায়মন মাহিন নিহত হন। আহত হৃদয় চন্দ্র তরুয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই মারা যান।

পরদিন, ১৯ জুলাই চান্দগাঁও থানার তৎকালীন উপ-পুলিশ পরিদর্শক পল্লব কুমার ঘোষ বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। এতে ৭০০ থেকে ৮০০ জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ১৩ জনকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তবে তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২১ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. ছবেদ আলী আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার ১৩ জনের কারও বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই তাদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

এরই মধ্যে নিহত তিনজনের পরিবারের পক্ষ থেকেও পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

চান্দগাঁও থানার তিন হত্যা মামলা

২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট তানভীর সিদ্দিকীর চাচা মোহাম্মদ পারভেজ চান্দগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার জিআর নম্বর ২৪৮/২০২৪।

একই বছরের ৩০ আগস্ট সায়মন মাহিন হত্যার ঘটনায় তার বন্ধু মোহাম্মদ শরীফ হত্যা মামলা করেন। এতে ৪৪ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার জিআর নম্বর ২৫৮/২৪।

২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হৃদয় চন্দ্র তরুয়া হত্যার ঘটনায় মামলা করেন তার কথিত বন্ধু মোহাম্মদ আজিজুল হক। মামলায় ২০৬ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলার জিআর নম্বর ২৮৫/২৪।

পাঁচলাইশ থানার মামলাগুলোর মতো চান্দগাঁও থানার এই তিনটি হত্যা মামলাও তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চান্দগাঁও থানার মামলাগুলোতেও একই প্রশ্ন

চান্দগাঁও থানায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলার নথি বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে নানা অসংগতি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, হৃদয় চন্দ্র তরুয়া হত্যা মামলার ২৬ নম্বর এবং তানভীর সিদ্দিকী হত্যা মামলার ২৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে নগরের জামালখান ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনকে।

তানভীর হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই শৈবাল দাশ সুমনসহ অন্য আসামিরা চাপাতি, কিরিচ ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বহদ্দারহাট ওয়াপদা অফিসের দিক থেকে এসে ইট-পাথর নিক্ষেপ এবং এলোপাতাড়ি গুলি চালান। এতে তানভীর সিদ্দিকী গুলিবিদ্ধ হন।

কিন্তু চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ওই দিনও দেশে ছিলেন না শৈবাল দাশ সুমন। তিনি ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ২২ জুলাই দেশে ফেরেন। ফলে ঘটনার সময় বিদেশে থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে চাপাতি, কিরিচ কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নিলেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে কেন তাকে মামলার আসামি করা হলো, সেটিও স্পষ্ট নয়।

হৃদয় হত্যা মামলায় বাদির দাবি

চান্দগাঁও থানার তিন মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে হৃদয় চন্দ্র তরুয়া হত্যা মামলাকে ঘিরে। এই মামলায় ৭ নম্বর আসামি করা হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে।

কিন্তু মামলার বাদি মোহাম্মদ আজিজুল হক জানিয়েছেন, মামলা দায়েরের সময় তিনি আ জ ম নাছির উদ্দিনের নাম দেননি। তার দাবি, থানায় মামলা করতে গেলে সঙ্গে থাকা লোকজনের মধ্যে একজন তাকে আগে থেকেই টাইপ করা একটি কাগজ দেন। তিনি কেবল সেখানে স্বাক্ষর করেন। পরে জানতে পারেন, সেই এজাহারে সাবেক মেয়রের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

এসব বিষয় উল্লেখ করে আ জ ম নাছির উদ্দিনকে মামলা থেকে অব্যাহতি বা খালাস দেওয়ার আবেদন জানিয়ে আদালতে হলফনামা দেন মোহাম্মদ আজিজুল হক।

এই ঘটনাকে ঘিরে আইনবিদরা প্রশ্ন তুলছেন, অন্যের তৈরি করা এজাহারে কেবল স্বাক্ষর করে দায়ের হওয়া একটি মামলা কতটা নিরপেক্ষ তদন্ত কিংবা ন্যায়বিচারের ভিত্তি হতে পারে।

এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

সাধারণ ফৌজদারি মামলার গণ্ডি পেরিয়ে এই বিতর্ক পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নিহত ফয়সাল আহমেদ শান্তর বাবা মো. জাকির হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর বরাবর একটি আবেদন করেন। যার জিডি নম্বর ৬৮২।

আইনজীবীর মাধ্যমে করা ওই আবেদনে পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাসহ ৭৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আরও এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৬ জুলাই পাঁচলাইশ থানায় দায়ের হওয়া মামলার বাদি তৎকালীন উপ-পুলিশ পরিদর্শক দীপন দেওয়ানও এই আবেদনে আসামি হন।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, ১৮ জুলাই ও ৪ আগস্ট চট্টগ্রামে সংঘটিত ছয়টি হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা একত্র করে এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। মামলার নম্বর ০২/২০২৬।

তদন্ত প্রতিবেদনে নতুন বিতর্ক

চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ জমা দেন প্রসিকিউশন। এতে জিডিতে উল্লেখ থাকা ৭৭ জনের পরিবর্তে ২২ জনকে চূড়ান্ত আসামি করা হয়। এরপরই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

জুলাই আন্দোলনজুড়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ছিল। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন স্থানে পুলিশকে প্রকাশ্যে গুলি চালাতে দেখা যায়। সে সময় জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেই ছবি ও ভিডিওও প্রকাশিত হয়।

নিহত ফয়সাল আহমেদ শান্তর বাবার আবেদনে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, উপ-পুলিশ পরিদর্শক দীপন দেওয়ান, অতিরিক্ত উপকমিশনার নোবেল চাকমা, কনস্টেবল দেবাশীষ বড়ুয়া, খোকন দাশ, ডিবির উপ-পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলামসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম ছিল।

কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনের চূড়ান্ত আসামির তালিকা থেকে সব পুলিশ কর্মকর্তার নামই বাদ দেওয়া হয়। যাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর অভিযোগ এবং সেই সম্পর্কিত ছবি-ভিডিও রয়েছে, তাদের বাদ দেওয়ার কারণ কী, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

আইসিটির আসামি তালিকায় যাদের নাম নিয়ে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদনে আসা অন্য আসামিদের তালিকা বিশ্লেষণেও দেখা যায় একাধিক অসংগতি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে মামলার ৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে। অথচ ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় নিহত মো. ওমর ফারুক হত্যা মামলার বাদি মো. দুলাল, ১৮ জুলাইয়ের ঘটনায় হৃদয় চন্দ্র তরুয়া হত্যা মামলার বাদি মোহাম্মদ আজিজুল হক এবং ৪ আগস্ট কোতোয়ালী থানার একটি মামলার বাদি ফাতেমা তুজ জোহরাসহ অন্তত আট থেকে ১০টি মামলার বাদি আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন, তারা আ জ ম নাছির উদ্দিনের নাম এজাহারে দেননি। তাদের দাবি, ব্যক্তিস্বার্থে কেউ একজন তার নাম যুক্ত করেছেন এবং তিনি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।

আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। ১৮ জুলাইয়ের ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় দায়ের হওয়া তানভীর সিদ্দিকী ও সায়মন মাহিন হত্যা মামলায় আ জ ম নাছির উদ্দিনের নামই ছিল না। অথচ একই ঘটনার অন্তর্ভুক্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে আসামি করা হয়েছে।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত না থাকার দাবিতে একাধিক বাদির হলফনামা থাকার পরও কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে কি না। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং জামালখান ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনকেও আসামি করা হয়েছে।

কিন্তু অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১৬ ও ১৮ জুলাই সংঘটিত ছয়টি হত্যাকাণ্ডের সময় দুজনের কেউই দেশে ছিলেন না। চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে আসা তথ্য অনুসারে, মহিউদ্দিন বাচ্চু ১৩ জুলাই কানাডায় যান এবং ২৫ জুলাই দেশে ফেরেন। অন্যদিকে শৈবাল দাশ সুমন ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ২২ জুলাই দেশে ফেরেন। ফলে ঘটনাকালে বিদেশে অবস্থান করলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন এবং একই সময়ে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

আইনজীবীরা যা বললেন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিহত ফয়সাল আহমেদ শান্তর বাবা মো. জাকির হোসেনের পক্ষে জিডির আবেদন করেছিলেন আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান।

তদন্ত প্রতিবেদনে সব পুলিশ কর্মকর্তার নাম বাদ পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো তদন্ত প্রতিবেদন পছন্দ না হলে নারাজি দেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদন দেখারও সুযোগ নেই।’

মামলার ফরমাল চার্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখনও ফরমাল চার্জ দেখিনি। মামলাটি আমার ফলোআপে নেই। আমি শুধু বাদির পক্ষে জিডির আবেদন করেছিলাম।’

প্রসিকিউশনের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে জানতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রশাসনিক বিষয়ে মন্তব্য করার এখতিয়ার তার নেই।

সিপি

ksrm