আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো জিকির। এটি এমন একটি ইবাদত, যা অত্যন্ত সহজ হলেও এর মর্যাদা ও ফজিলত অপরিসীম। আল্লাহর স্মরণে মুমিনের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে, হৃদয় পায় স্বস্তি ও স্থিরতা। একজন প্রকৃত ঈমানদার সর্বদা আল্লাহর জিকিরে নিমগ্ন থাকেন। জিকিরের বিশেষত্ব হলো, এটি যেকোনো সময় ও যেকোনো অবস্থায় করা যায়। বসে, দাঁড়িয়ে, শুয়ে কিংবা চলাফেরার সময়ও আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকা সম্ভব। মানুষের জীবনে যখন হতাশা, উদ্বেগ কিংবা মানসিক অস্থিরতা ভর করে, তখন আল্লাহর জিকিরই অন্তরে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। জিকির-আজকারের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও নৈকট্য লাভ করে।
মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জনের জন্য মুসলিম উম্মাহর সামনে সহজ ও সংক্ষিপ্ত অনেক জিকিরের সুযোগ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।’ (সুরা আহযাব: ৪১)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, চারটি জিকির আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলা আমার কাছে সমগ্র পৃথিবী ও পৃথিবীর সবকিছুর চেয়েও অধিক প্রিয়।’
প্রতিটি মুমিন মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চায়। আর আল্লাহর প্রিয় হতে হলে তাঁর বিধান যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে এবং যেসব কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন, সেসব কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। ‘জিকির’ শব্দের অর্থ স্মরণ করা বা বর্ণনা করা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর স্মরণকেই জিকির বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে সব ইবাদতের প্রাণই হলো আল্লাহর জিকির। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সর্বাবস্থায় তাঁর অধিক স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদিসে ‘দুনিয়ার চেয়েও প্রিয়’ বলার অর্থ হলো, পৃথিবী ও পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়েও এসব জিকিরের মর্যাদা বেশি। হজরত ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, এর অর্থ হলো সাওয়াব ও মর্যাদার বিচারে এসব জিকির দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, শ্রেষ্ঠ বাক্য চারটি হলো— ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’। অর্থাৎ আল্লাহ পবিত্র, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্য বর্ণনায় এসেছে, এ চারটি বাক্য আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং এর যেকোনোটি পাঠ করলে মানুষের কোনো ক্ষতি হয় না। এসব বাক্যের মধ্যে আল্লাহর পবিত্রতা, তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলি, একত্ববাদ এবং মহিমার ঘোষণা রয়েছে। এ কারণেই এগুলো আল্লাহর নিকট এত প্রিয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ৩৩ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করবে, এরপর একশ পূর্ণ করার জন্য বলবে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’, তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমান হয়।
উম্মু হানী (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি আমল শিখিয়ে দিন। আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি, দুর্বল হয়ে পড়েছি এবং শরীরও ভারী হয়ে গেছে।’ উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি ১০০ বার আল্লাহু আকবার, ১০০ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ১০০ বার সুবহানাল্লাহ পাঠ করো। এটি আল্লাহর পথে জিন-লাগামসহ ১০০ ঘোড়া দান করার চেয়েও উত্তম, ১০০ উট দান করার চেয়েও উত্তম এবং ১০০ গোলাম মুক্ত করার চেয়েও উত্তম।’
সুনানে বায়হাকিতে বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক আরব বেদুইন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে একটি উত্তম আমল শেখানোর অনুরোধ করেন। তখন তিনি বেদুইনের হাত ধরে তাকে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বেশি বেশি পাঠ করার নির্দেশ দেন।
প্রথমে বেদুইনটি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি এবং সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর আবার ফিরে এসে প্রশ্ন করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এসব বাক্য তো আল্লাহর জন্য। এতে আমার জন্য কী রয়েছে?’
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি যখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে, আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’ তুমি যখন ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলবে, আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’ তুমি যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’ আর তুমি যখন ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে, আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’
এরপর বান্দা আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও চাহিদাগুলো পেশ করবে। যদি সে বলে, ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি’— হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।’ যদি বলে, ‘আল্লাহুম্মারজুকনি’— হে আল্লাহ! আমাকে রিজিক দান করুন, তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমি তোমাকে রিজিক দান করেছি।’ যদি বলে, ‘আল্লাহুম্মারহামনি’— হে আল্লাহ! আমার প্রতি দয়া করুন, তখন আল্লাহ বলবেন, ‘আমি তোমার প্রতি দয়া করেছি।’ এভাবে জিকিরের পর বান্দা আল্লাহর কাছে যা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন।
সর্বোত্তম জিকির হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বোত্তম দোয়া হলো ‘আলহামদুলিল্লাহ’। এ দুটি বাক্যের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। এগুলো মানুষকে আল্লাহর অনুগত ও কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত করে।
আল্লাহর জিকিরেই মানুষের প্রকৃত শান্তি ও মুক্তি নিহিত। জিকির মানুষের পার্থিব ও পরকালীন সফলতার অন্যতম সোপান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা আনফাল: ৪৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর এবং ঘুমানোর আগে ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ জিকির হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আলহামদুলিল্লাহ।’ হাদিসে আরও এসেছে, যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করবে, তার এক হাজার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বাইরে মানুষ যত ইচ্ছা জিকির ও দোয়া করতে পারে। হাঁটতে-চলতে, যানবাহনে বসে, অপেক্ষারত অবস্থায় কিংবা অবসরে সহজেই এসব জিকির পাঠ করা যায়। এর জন্য কোনো বিশেষ প্রস্তুতি, কষ্ট বা পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই।
আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি জিকির হলো, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।’ এর অর্থ, ‘মহান আল্লাহ পবিত্র এবং তাঁরই জন্য সব প্রশংসা। মহান ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী আল্লাহ পবিত্র।’
মানুষ যেন সর্বদা আল্লাহর তাসবিহ, তাহলিল, প্রশংসা ও গুণগানে মশগুল থাকে, এটিই মহান আল্লাহর কাম্য। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ছোট ছোট সহজ জিকিরের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা অর্জনের তাওফিক দান করুন। তিনি আমাদের সবাইকে বেশি বেশি ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করার তাওফিক দান করুন এবং মৃত্যুকালে কালিমার ওপর অটল থাকার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট




