জামিনের দামে ১ কোটির কলরেকর্ড ‘জেনুইন’, মুনিরীয়ার ছায়ায় ফজলে করিমের মামলায় বিস্ফোরক মোড়

জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা চাওয়ার কথোপকথনের অডিও ‘জেনুইন’ বা সত্যিকারের বলে নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় গঠিত তথ্যানুসন্ধান কমিটি। ওই মামলায় ফজলে করিমকে ‘ফাঁসাতে’ রাউজানভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির কাছ থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট অন্তত অপর একজন কর্মকর্তা ঘুষ নিয়েছেন—এমন অভিযোগও ওঠে। এমনকি তদন্তে প্রভাব ফেলতে এবং চার্জশিটের ধরন বদলাতে আর্থিক লেনদেনের কথাও আলোচনায় এসেছে বলে দাবি করেছে ফজলে করিমের পরিবার।

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার নামে ১ কোটি টাকা দাবির অডিও নিয়ে নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় গঠিত তথ্যানুসন্ধান কমিটি বলছে, ফাঁস হওয়া কথোপকথনটি ‘জেনুইন’ এবং এতে ফজলে করিমের পরিবারের এক সদস্য ও তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের কণ্ঠ শনাক্ত হয়েছে।

কলরেকর্ডের বিষয়ে কমিটির প্রধান ও ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তাদের অনুসন্ধানে কথোপকথনটি সত্যিকারের বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং এটি কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নয়। সাইমুম রেজা তালুকদার নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। পাঁচ সদস্যের এই কমিটি এখনও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি, অনুসন্ধান চলছে।

গত ১০ মার্চ এই ঘটনা তদন্তে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে। এর আগে সাইমুম রেজা তালুকদারের পাশাপাশি প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায়, চট্টগ্রামে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন পাইয়ে দিতে তার পরিবারের এক সদস্যের কাছে ১ কোটি টাকা দাবি করছেন সাইমুম রেজা তালুকদার।

সাইমুম রেজা তালুকদার প্রসিকিউটরের দায়িত্বে থাকাকালে ফজলে করিমের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ৯ মার্চ ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করেন। পেশায় শিক্ষক এই ব্যক্তি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন এবং জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান।

চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের দাবি, আটকের প্রায় দুই মাস পর গত বছরের এপ্রিলে প্রথম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাইমুম রেজা। টাকার বিনিময়ে জামিন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন তিনি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পরিবারটি তার সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করা শুরু করে এবং তাদের হিসাবে, তিনি মোট ২৬ বার যোগাযোগ করেন, যার মধ্যে অন্তত ১৪ বার সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ঘুষ দাবি করা হয়।

অভিযোগ ওঠার পর ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তাকে মামলাটি থেকে সরিয়ে দেন, তবে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন শেষে বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ফেব্রুয়ারিতে তাজুল ইসলামকে সরিয়ে আমিনুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দুই কলরেকর্ডে প্রসিকিউটরের এক কোটির গল্প

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি বহুল আলোচিত মামলায় চট্টগ্রামের রাউজানের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে খালাস পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি টেলিফোন কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর ৯ মার্চ তাকে প্রসিকিউটরের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দায়ের করা গণহত্যার মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত ও ৪৫৯ জন আহত হন এবং এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং ইতিমধ্যে তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের রাউজান আসনে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য ছিলেন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো, অস্ত্রের মুখে জমি লিখিয়ে নেওয়া, ভাঙচুর ও দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩২টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন মামলায় তাকে একাধিকবার রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কলরেকর্ডগুলোর একটিতে ফজলে করিম চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী ও আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারকে। রিজওয়ানা ইউসুফ ফারাজ করিম চৌধুরী ও ফারহান করিম চৌধুরীর মা। ফজলে করিমের সঙ্গে দীর্ঘদিন আগে বিচ্ছেদ হলেও তাকে গ্রেপ্তারের পর আইনজীবী হিসেবে এগিয়ে আসেন তিনি।

ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, ‘এখন টোটাল অ্যামাউন্টটা বলবো, নাকি আপাতত একটি টাকার এমাউন্ট বলবো?’ উত্তরে রিজওয়ানা ইউসুফ বলেন, ‘টোটাল ও আপাতত দুটি এমাউন্টই বলো ভাইয়া।’ জবাবে সাইমুম রেজা বলেন, ‘আপনাকে একটা হিন্টস দিয়েছিলাম, বলছিলাম যে যদি আলটিমেটলি একটা ব্যবস্থা করা যায়, তারপর ভেঙে ভেঙে সেটা… টোয়েন্টি… টোয়েন্টি…।’

অজ্ঞাতনামা নারীর বিদেশি নম্বরে গোপন আলাপ

আরেকটি কলরেকর্ডে অজ্ঞাতনামা এক নারীর সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় সাইমুম রেজা তালুকদারকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই নারী অর্থ লেনদেনের বিষয়টি ‘এটা আপনি আর চাচীর বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারী ফজলে করিমের কোনো এক ভাইয়ের মেয়ে হতে পারেন।

ওই ফোনালাপে ফজলে করিমের মামলাকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউটরদের বৈঠকের পরিকল্পনা, তাদের অবস্থান প্রভাবিত করার আলোচনা এবং আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, বর্তমানে যে প্রসিকিউটর আছেন তিনি ‘ভালো’ ও ‘রিজনেবল’ মানুষ। সামনে মামলাটি নিয়ে তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম, নোমান, তিনি নিজে এবং চিফ প্রসিকিউটর ও জোহা একসঙ্গে বসবেন। সেখানে অন্যরা বিপক্ষে অবস্থান নিলেও তিনি নিজের পক্ষ থেকে ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন। তার ভাষায়, সবার কথা শুনে চিফ প্রসিকিউটর সিদ্ধান্ত নেবেন না, তিনি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এই আলাপের সময় তিনি ওই নারীকে সতর্ক করে বলেন, তথ্যটি অন্য কোথাও যেন না যায়, নইলে উল্টো ফল হতে পারে। নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘খুবই সাহসী’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দল ক্ষমতায় থাকায় তিনি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে সেই সিদ্ধান্তের জন্য পাশে সমর্থন দরকার হবে এবং তিনি নিজেও সেই সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান।

একপর্যায়ে আসন্ন বৈঠকের সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিগগিরই বৈঠক হতে পারে। বিষয়টি দ্রুত প্রসিকিউটরের কাছে পৌঁছে দিতে বিএনপির কোনো নেতার মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার কথাও বলেন। এ ক্ষেত্রে রাঙ্গুনিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল অথবা মন্ত্রী পর্যায়ের কারও মাধ্যমে বিষয়টি জানানো যেতে পারে বলে পরামর্শ দেন।

‘পার্ট পেমেন্ট চাবো নাকি একবারে চাবো’

সাইমুম রেজার কথোপকথনে ফজলে করিমের ছোট ছেলে ফারহান করিম চৌধুরীর প্রসঙ্গও আসে। তিনি বলেন, ‘না আই অ্যাম নট টকিং উইথ ইউ। আই অ্যাম টকিং উইথ ফারহান এন্ড আদার।’ জবাবে ওই নারী বলেন, ‘ওহ্ ভাইয়া নাই। ভাইয়া কথা বলতে পারে নাই। কারণ ভাইয়ার অসম্ভব ফুড পয়জনিং। আর ভাইয়া অসম্ভব প্রাইভেট। জীবনেও ওনার পেট থেকে কোনো কথা বের হয় না।’ তখন সাইমুম রেজা বলেন, ‘ঠিক আছে, আমার দিক থেকে আমি ট্রাই করবো। অ্যাডভার্সারি তো আছেই।’

ফোনালাপের শেষ দিকে আর্থিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। সাইমুম রেজা বলেন, ‘আর একটি জিনিস ফ্রাংকলি বলি। আমি জানি না, আমি কি আপনাদের থেকে পার্ট পেমেন্ট চাবো নাকি একবারে চাবো—কোনটি বেটার হয়, কোনটি ওয়াইজ হয়?’

জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, লেনদেনের বিষয়টি তার নয়; এটি তিনি ও ‘চাচী’র বিষয়। ‘চাচী’ জানতে চেয়েছেন কখন তার কাছে যেতে পারবেন।

জবাবে সাইমুম রেজা বলেন, ‘বিদেশি নাম্বার হলে বেস্ট। ওনার নাম্বারটা সেইফ না।’

ট্রাইব্যুনালের টার্গেটে ফজলে করিম একা

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মো. ফারুক নিহত হন। ওই ঘটনায় আওয়ামী লীগের কর্মী ও তাদের রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা শুরুতে প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করে রাউজানের সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে অভিযুক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার আইনজীবীদের কাছে দেওয়া এক পাতার একটি নোটে দাবি করা হয়, ১৬ জুলাইয়ের ওই ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন। তবে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নোটটিতে উল্লেখ করা হয়নি।

২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমানের আবেদনের পর বিচারকেরা তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেপ্তার ও আটকাদেশ দেন। অন্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের আবেদন তখন করা হয়নি।

ট্রাইব্যুনাল যখন তাকে আটকাদেশ দেন, কয়েক মিনিট পর ট্রাইব্যুনালের বাইরে সংবাদ সম্মেলন করেন দুজন ব্যক্তি। তাদের একজন মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং অন্যজন জুবায়ের আহমেদ। তারা দাবি করেন, ঘটনায় অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনি রাউজানের ফজলে করিমের নেতৃত্বে কাজ করতেন।

তবে বাস্তবে ফজলে করিমের সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ওই দুই নেতার দৃশ্যত কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা দুজনই সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, চট্টগ্রাম শহরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যখন বিভিন্ন প্রমাণে অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তখন কেন শুধু ফজলে করিমকেই অভিযুক্ত করা হলো। তার নির্বাচনী এলাকা রাউজান শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এবং আন্দোলনের সময় সেখানে কোনো সহিংসতার ঘটনাও ঘটেনি।

মামলায় ‘মুনিরীয়া’র ছায়া

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ফজলে করিম চৌধুরীকে মামলায় ‘ফাঁসাতে’ রাউজানভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির কাছ থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট অন্তত একজন কর্মকর্তা ঘুষ নিয়েছেন। এমনকি তদন্তে প্রভাব ফেলতে এবং চার্জশিটের ধরন বদলাতে আর্থিক লেনদেনের কথাও আলোচনায় এসেছে বলে দাবি করেছে ফজলে করিমের পরিবার।

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বলা হয়েছিল যেন ফজলে করিম চৌধুরী ও তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর নাম রেখে বাকি অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়। তবে ট্রাইব্যুনাল এই প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়। এরপরই আসামিদের নাম সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার জন্য এক কোটি টাকার নতুন দাবি সামনে আসে।

ফজলে করিমের পরিবার জানায়, গত বছরের শেষ দিক থেকে তার সাবেক স্ত্রী ও আইনজীবী ব্যারিস্টার রিজওয়ানা ইউসুফ এবং দুই ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী ও ফারহান করিম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিক প্রসিকিউটরের গোপন ফোনালাপ হয়। গত কয়েক মাস ধরে এসব ফোনকল তারা রেকর্ড করে রাখছিলেন।

পরিবারের দাবি, এসব ফোনালাপের একটিতে ট্রাইব্যুনাল থেকে অব্যাহতি পাওয়া প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার আইসিটির একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ওই তদন্ত কর্মকর্তা ফজলে করিম চৌধুরীর বিচারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসা ধর্মীয় সংগঠন মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলমান থাকলেও ফজলে করিমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে মুনিরীয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সক্রিয়তা দেখা গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মুনিরীয়ার চাপের কথা প্রসিকিউটরের মুখে

এই মামলার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে বলেন, ‘মুনিরীয়া কোনোভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে এবং ফজলে করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিশ্চিত করতে জনতার চাপ তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আমরা আইসিটির প্রসিকিউটর হিসেবে, এবং এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর হিসেবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত আপাতদৃষ্টিতে অভিযোগের ভিত্তি পাই, ততক্ষণ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছি না। সে কারণেই মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেই এলাকায় কোনো নৃশংস ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রাম শহরে, যেখানে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, সেখানে ফজলে করিমের কোনো সাংগঠনিক দায়িত্বও ছিল না; তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন না।’

তবে মুনিরীয়ার দেওয়া মূল অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ফজলে করিম ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলেন। নোমান বলেন, ‘এই অভিযোগটি আমরা এখনও তদন্ত করে দেখছি।’

সিপি

ksrm