জামালখানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিকৃত তথ্যের ফলক, ক্ষোভের ঝড়

0

চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিকৃত ও অসম্পূর্ণ তথ্য সম্বলিত ম্যুরাল নিয়ে ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। ইতিহাসের এমন বিকৃতি নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীবহুল স্কুলগুলোর পাশে এমন একটি ম্যুরালে বিকৃত ও অসম্পূর্ণ তথ্যের উল্লেখ থাকায় বিশেষ করে কোমলমতি স্কুল শিক্ষার্থীরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিকৃত ও অসম্পূর্ণ তথ্য জানছে।

১ জানুয়ারি নগরীর জামালখানে এই ম্যুরালের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক। এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ছিলেন ২১ নং জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন।

জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় এই ঘটনা কোনো সাধারণ হত্যা বা গুপ্তহত্যা ছিল না। এর কারণও ‘গুপ্তহত্যা’ নয়। অথচ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জামালখান ওয়ার্ডে স্থাপিত এক বিশাল ফলকে বঙ্গবন্ধুর পরিচিতি লিখতে গিয়ে জানানো হয়েছে—‘বঙ্গবন্ধু হত্যার কারণ হল গুপ্তহত্যা’। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার কারণ তো নয়ই, এমনকি হত্যার ধরনও কথিত ‘গুপ্তহত্যা’ নয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কেও বিকৃত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ দেখবে জামালখান’ শিরোনামের ওই ফলকে।

বিতর্কিত তথ্যসম্বলিত ম্যুরালের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।
বিতর্কিত তথ্যসম্বলিত ম্যুরালের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে আসছেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল স্বাধীনতার মূল চেতনা, সংস্কৃতি ও সংবিধানকে হত্যা করা।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কারণ ছিল দুটি— এক. যেন তার পরিবারের কাউকে কেন্দ্র করে আবার সেই আদর্শ উজ্জীবিত না হয়, দুই. এমন আতঙ্ক সৃষ্টি যাতে কেউ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দাঁড়াতে সাহস না পায়।’

মুনতাসীর মামুন তার ‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন’ বইয়ের উদ্ধৃতি টেনে লিখেছেন, ‘বিএনপি আমলে এমন কী শেখ হাসিনার আমলেও সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে বলা হতো এবং অনেক বিএনপি-জামাত অ্যাপলজিস্ট ও ‘নিরপেক্ষ’রা বলতেন এবং বলেন, একদল বিপথগামী সেনাসদস্য শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় দু-ডজন সেনা কর্মকর্তার আত্মস্মৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই ফারুক-রশীদদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন। এমন কী জিয়াউর রহমানও, কিন্তু কেউ বঙ্গবন্ধুকে জানান নি।’

ইতিহাসের এমন বিকৃতি নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা।
ইতিহাসের এমন বিকৃতি নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কারণ কোনভাবেই গুপ্তহত্যা হতে পারে না। এদেশকে পশ্চাৎপদ করার জন্য একদল বিপথগামী সেনা সদস্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উনাকে সপরিবারে হত্যা করেছে। কারা খুনি এটা সবাই জানে।’

ড. ইফতেখার বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু গুপ্তহত্যার শিকার— এই কথা যেই বলুক না কেন তিনি ভুল বলেছেন। উনাদের এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়া উচিত। এই ধরনের ভুলের জন্য তাদের ক্ষমা চাওয়াও উচিত বলে আমি মনে করি।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর চট্টগ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়া তৎকালীন ছাত্রনেতা ও চট্টগ্রাম ৮ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিনও একইভাবে বলেন, ‘দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। মূলত এর মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশকেই হত্যা করতে চেয়েছিল। এজন্য সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। এটি কোনভাবেই গুপ্তহত্যা নয়।’

অন্যদিকে এটিকে অজ্ঞানতাপ্রসূত ভুল বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডকে কেউ গুপ্তহত্যা বলে থাকলে সে মূলত অজ্ঞানতাপ্রসূত কারণে এই ভুল করেছে। এটি মূলত শব্দচয়নের অদক্ষতা। এই ভূলটি সংশোধন করে নেওয়া উচিত।’

অন্যদিকে একইভাবে দ্রুত এই ভুল সংশোধনের তাগাদা দিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারাও। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা পরিষদের সাবেক মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম বলেন, ‘ম্যুরালের উদ্যোগটা ভাল। কিন্তু একটি জায়গায় ভুল হয়েছে। আমরা উদ্যোগটিকে স্বাগত জানাই। এই ভুলটি দ্রুত সংশোধন করে নিলেই হচ্ছে।’

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ম্যুরালে মামুলি
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কেও বিকৃত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। ওই তথ্য দেখে যে কারোরই মনে হবে, ১৯৭৫ সালের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কেবল আওয়ামী লীগের কোনো মামুলি দায়িত্বে ছিলেন। অথচ প্রকৃত সত্য যে, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন বর্ণাঢ্য, সংগ্রামমুখর ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।

১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু এর অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করার পর শেখ মুজিব মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে এই নতুন দলে যোগ দেন। তাঁকে দলের পূর্ব পাকিস্তান অংশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী জেনারেল (মহাসচিব) নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। তখনও শেখ মুজিব পুনরায় দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।

এই বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল না ধরায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া স্থানীয় কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনকে ফোন করা হলে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সিপি/এআরটি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন