জামালখানের ‘দুই ঘণ্টার বাজার’, দিনের ব্যস্ততা শুরুর আগেই শেষ কেনা-বেচা

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৭টা। বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে ছুটছেন অভিভাবকরা, আবার অনেকে প্রাতঃভ্রমণ করতে ছুটছেন ফুটপাতের ওপর দিয়ে। এর মধ্যে ফুটপাতের ওপর বাহারি শাক-সবজির ঢালা সাজিয়ে বসছেন বিক্রেতারা, আবার অনেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ত্রিপলের ওপর সাজিয়ে রাখছেন। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথে অনেকে থামছেন এই বাজারের সামনে। আবার অনেকে আশপাশের এলাকা থেকেও আসছেন কেনাকাটার জন্য।

এমন চিত্র চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানের সিঁড়ির গোড়া এলাকার। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত, শুধুমাত্র দুই ঘণ্টার এ বাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকে উপচে পড়া। বিক্রি শেষে আবার ফুটপাত ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে যান বিক্রেতারা। বহু বছর ধরে এভাবেই চলছে এই ‘দুই ঘণ্টার বাজার’। তবে বর্তমানে সিঁড়ির গোড়া ছাড়িয়ে খাস্তগীর স্কুলের মোড় এবং অপরপ্রান্তে চেরাগী পাহাড় মোড় পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মিটার সড়ক ও ফুটপাতজুড়ে বাজার বিস্তৃত হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ভ্যান গাড়িতে শাক-সবজি বিক্রেতা। আবার কোনো কোনো সময় এই বাজার সকাল ১০টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, জামালখান ছাড়াও আশপাশের রহমতগঞ্জ, মোমিন রোড, হেমসেন লেন, নন্দনকানন, আসকার দীঘি এলাকার লোকজনও বাজার করতে এসেছেন এখানে। আবার অনেকে একটু দূরের লাভ লেন, চকবাজার, কোতোয়ালী থেকেও এসেছেন বাজার করতে। এদের মধ্যে অনেকে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে যাওয়ার পথে বাজার করছেন, আবার অনেকে বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ঘরের ফেরার পথে বাজার করে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিক্রেতাদের মধ্যে পুকুরের ও সামুদ্রিক মাছ নিয়ে বসেছেন। সঙ্গে পাশে বসে মাছ কাটছেন অন্যজন। কয়েকজন বিক্রেতা সবজি ও শাকের আঁটি সাজিয়ে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে ক্রেতার কমতি নেই এখানে।

এখানে সাধারণত কর্মজীবী মানুষরাই বাজার করতে আসেন। অল্প সময়ে বাজার করে তারা বাসায় পৌঁছে, দ্রুত ছুটতে পারেন অফিসে। আবার এক জায়গায়তেই সব কিছু পেয়ে যান। এই বাজারে মাছ-সবজির দাম কিছুটা বেশি হলেও ক্রেতাদের কমতি নেই।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আলু ২৫ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০–৫০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, ঢেঁড়শ ৭০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০–৬০ টাকা, ঝিঙা ৫০–৬০ টাকা, বরবটি ৭০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ টাকা, কচুর লতি ৬০ টাকা, কচুরমুখি ১০০ টাকা, বেগুন ৬০–৬৫ টাকা, বেগুন (লম্বা) ৬০ টাকা, টমেটো ১২০ টাকা, গাজর (দেশি) ১৪০ টাকা, গাজর (চায়না) ১২০ টাকা, শসা (দেশি) ৭০–৮০ টাকা, লাউ ৮০–৯০ টাকা, চালকুমড়া ৭০–৮০ টাকা, কাঁচা কলা ৪০ টাকা হালি, ধনেপাতা (কেজি) ২০০ টাকা, লেবু ৩০–৪০ টাকা হালি এবং কচুশাক, মিষ্টিকুমড়া শাক, পুঁইশাক ও লালশাক ৩০ টাকা আঁটি বিক্রি করা হচ্ছে।

এছাড়া মাছের মধ্যে—ইলিশ (বড়) কেজি ২ হাজার ৮০০ টাকা, ইলিশ মাঝারি ১ হাজার ৭০০ টাকা, ইলিশ (মাঝারির চেয়ে ছোট) ১ হাজার ৩০০ টাকা, ঝাটকা ইলিশ ৪৫০–৬০০ টাকা, চিংড়ি (সাগরের গলদা) ৬৫০ টাকা, চিংড়ি (ছোট) ৪৫০ টাকা, লইট্ট্যা ১৮০ টাকা, পোয়া (ছোট) ১৮০ টাকা, চাপিলা (ছোট) ১৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ টাকা, পাঙ্গাস ২২০ টাকা, রুই ২৮০ টাকা, কাতলা ২৮০ টাকা, কৈ ৪৫০ টাকা, কোরাল ৩৮০ টাকা, সুরমা ৪৫০ টাকা, রূপচাঁদা ৬৫০ টাকা, ব্রিগেড ১৮০ টাকা, মৃগেল ২০০ টাকা, গ্রাস কার্প ২০০ টাকা, সিলভার কার্প ২৪০ টাকা এবং ডিমওয়ালা কার্প বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৫০ টাকা। তবে এখানে বেশিরভাগ মাছই মাঝারি থেকে ছোট আকারের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অল্প সময়ের জন্য বসা এই বাজারে একই জায়গায় মাছ, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। ফলে এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এটি বেশ সুবিধাজনক। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ অফিসে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় বাজার করে নিতে পারেন।

বাজার করতে আসা লাভ লেন এলাকার বাসিন্দা নূরুল হক বলেন, ‘এই বাজারটা আমাদের জন্য বেশ সুবিধার। সকালে এখানে এসে মাছ-সবজি সবকিছুই পাওয়া যায়। সময়ও বেশি লাগে না। এলাকার মানুষের জন্য এই বাজারটা ভালো একটা সুবিধা।’

তবে বাজারের পণ্যের দাম আরও কমানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রেতারা। জামালখান এলাকার বাসিন্দা ফাহমিদ হক বলেন, ‘বাজারটা ভালো, সকালে বাজার করা যায়। তবে আমরা চাই জিনিসপত্রের দাম যেন আরেকটু কম থাকে।’

ব্যবসায়ীরা জানান, ফুটপাতের ওপর বাজার বসায় দিনের ব্যস্ততা শুরুর আগেই তাদের বেচাকেনা শেষ করতে হয়। ব্যবসায়ীদের একজন ফাজলু মিয়া বলেন, ‘যেহেতু ফুটপাতে বাজার বসে, সেহেতু আমরা সকালে অফিস-আদালত, স্কুল শুরু হওয়ার আগেই বসি। প্রায় ৯টা থেকে ১০টার ভেতর শেষ করে চলে যাই।’

ডিজে

ksrm