জাবেদের গুলশানের ফ্ল্যাট খুলতেই রোলেক্সের বক্স, বিএমডব্লিউর ৫ চাবি, ৫৩২ টাই, ৩০০ কোট…

বেরিয়ে এলো বিলাসবহুল সামগ্রীর লম্বা তালিকা

ঢাকার গুলশানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুটি ফ্ল্যাটে আদালতের নির্দেশে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিলাসবহুল সামগ্রী, শত শত কোট-টাই, রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ির বক্স ও ওয়ারেন্টি কার্ড এবং পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফ্ল্যাট দুটি ক্রোকের অংশ হিসেবে রোববার (১৯ জুলাই) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সেখানে প্রবেশ করে মালামালের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে সংস্থাটি।

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তালিকায় ৩০০টির বেশি কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, ১০০টির বেশি কামিজ, তিন সেট মুক্তার অলঙ্কার, চারটি ঝাড়বাতি, একাধিক খাট ও সোফার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আটটি বিলাসবহুল ঘড়ির খালি বক্স পাওয়া গেছে, যার মধ্যে চারটি রোলেক্স ব্র্যান্ডের। এসব ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডও উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ির চাবি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির চাবিও রয়েছে। ফ্ল্যাটে থাকা দামি আসবাবপত্র ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীরও তালিকা করা হচ্ছে।

রোলেক্স ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডে মালিকের নাম

উদ্ধার হওয়া একটি রোলেক্স ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সেটি ১৮ ক্যারেট হোয়াইট গোল্ডের ‘Rolex Cellini Date’ (মডেল-৫০৫১৯)। ওয়ারেন্টি কার্ডে উল্লেখ রয়েছে, ঘড়িটি ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের Harrods ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনা হয়। কার্ডটিতে মালিক হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নাম, মডেল নম্বর ৫০৫১৯ এবং সিরিয়াল নম্বর ৭৩৪৫২৪৫৯ উল্লেখ রয়েছে।

বিলাসবহুল ঘড়ির বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মডেলের ব্যবহৃত একটি ঘড়ির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ লাখ টাকার বেশি।

আদালতের অনুমতি নিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ

গুলশানের ৬৬ নম্বর সড়কের নর্থওয়েস্ট (বি) ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে অবস্থিত ফ্ল্যাট দুটির মধ্যে এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুট এবং বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুট। দুটি ফ্ল্যাটের মোট আয়তন ৭ হাজার ৫৭৯ বর্গফুট।

গত বছরের ১৮ নভেম্বর দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত ফ্ল্যাট দুটি ক্রোকের আদেশ দেন। আদালত দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে ফ্ল্যাট দুটির রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেন।

তবে ফ্ল্যাট দুটি তালাবদ্ধ থাকায় রিসিভার সেখানে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। পরে দুদকের আবেদনের পর গত ২৯ এপ্রিল আদালত অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুপস্থিতিতেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে বাধাহীনভাবে ফ্ল্যাটে প্রবেশ এবং ভেতরে থাকা মালামালের তালিকা তৈরির অনুমতি দেন। সেই অনুমতির ভিত্তিতেই রোববার অভিযান চালানো হয়।

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তালিকা তৈরির কাজ চলে। কাজ শেষ না হওয়ায় সোমবার সকাল থেকে আবারও তালিকা তৈরির কার্যক্রম শুরু হবে। কাজ শেষে জব্দ করা মালামাল আদালতের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

লন্ডনেও বিলাসী জীবনযাপন

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিলাসী জীবনযাপনের নানা তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, লন্ডনে তাঁর প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পাঁচতলা বাড়িতে ব্যক্তিগত সিনেমা হল ছিল এবং তিনি অতিথিদের নতুন রোলস-রয়েস গাড়িও দেখিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি লন্ডনের হ্যারডস থেকে উটপাখি ও কুমিরের চামড়ার কাস্টম-মেড জুতা কিনতেন, যার দাম জোড়াপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার পাউন্ড। একই প্রতিবেদনে তিনি লন্ডন সফরে নিয়মিত কয়েক হাজার পাউন্ড ব্যয়ে দামি স্যুট কেনার কথাও বলেছিলেন।

দেশ-বিদেশে সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান

গণ-অভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ব্যবসা ছিল। তাঁর পরিবারের মালিকানায় ছিল ইউসিবি ব্যাংক। এছাড়া তিনি যুক্তরাজ্যে আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ নেতা-মন্ত্রীদের সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে তাঁর তিন শতাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মূল্য প্রায় ১৭ কোটি পাউন্ড।

অন্যদিকে দুদকের একটি যৌথ দল সাইফুজ্জামান ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের আবেদনে আদালত যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে থাকা তাঁর ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন। দুদকের হিসাবে, এসব সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানিতে তাঁর বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা।

পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তাঁর নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের মূল্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ২৩টি কোম্পানির শেয়ার জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। একই অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাবও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

এদিকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে দায়ের করা এক মামলায় চলতি বছরের মার্চে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তাঁর স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।

দুদকের বিভিন্ন আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।

সিপি

ksrm