ছাত্রলীগ সেক্রেটারির থাপ্পড় চট্টগ্রাম কলেজ কর্মকর্তাকে, শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ‘সরি’তেই মিটমাট (ভিডিওসহ)

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কোনো মোবাইল চোরকে চড়-থাপ্পড় মারছেন কেউ। কিন্তু ঘটনা আদতে তা নয়। যিনি চড় মারছেন তিনি হচ্ছেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আর যিনি চড় খাচ্ছেন তিনি কলেজের প্রধান অফিস সহকারী। ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে চড়-থাপ্পড় মেরেছেন অনুসারীরাও। কিন্তু এ ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর ‘হস্তক্ষেপে’ মাফ চেয়ে পার পেয়েছেন অভিযুক্ত ছাত্রনেতা।

অভিযুক্ত ওই ছাত্রলীগ নেতার নাম সুভাষ মল্লিক সবুজ। তার অনুসারীদের মধ্যে কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনির উদ্দিন রিহানও মারেন ওই কর্মচারীকে। এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দীন আরমান ক্যামেরার আড়ালে থেকে মারার নির্দেশ দেন বলে জানান ভুক্তভোগী।

ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম গোলাম কিবরিয়া। তিনি চট্টগ্রাম কলেজের প্রধান অফিস সহকারী।

ঘটনাটি গত বছরের ২২ ডিসেম্বরের। চট্টগ্রাম কলেজের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কমিটি গঠনের সময় কেন সবুজকে জানানো হলো না, সেই অপরাধেরই হামলার শিকার হন কিবরিয়া। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে এসেছে।

১ মিনিট ৪ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, গত ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সামনে কিবরিয়ার সঙ্গে কথা বলছেন সবুজসহ সাত যুবক। একপর্যায়ে সবুজ থাপ্পড় মারেন কিবরিয়ার গালে। এর পর পরই সবুজের কর্মী, কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনির উদ্দিন রিহান দু’হাতে সমানে কিবরিয়াকে থাপ্পড় মারতে থাকেন।

ঘটনার সময় ক্যামরার আড়ালে থেকে সবুজের আরেক কর্মী, কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দীন আরমান মারার নির্দেশ দেন বলে জানান ভুক্তভোগী কিবরিয়া।

জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সকল সরকারি কলেজে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পরিষদ গঠন করতে বলা হয়। সেই চিঠিতে কলেজের প্রধান অফিস সহকারীকে পদাধিকারবলে সভাপতি করারও কথা উল্লেখ করা হয়। অন্য পদগুলো কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে সমোঝতা করেই নির্বাচন করবেন। সে হিসেবে সভাপতি প্রধান সহকারী গোলাম কিবরিয়া অন্য কর্মচারীদের মতামতের ভিত্তিতে একটি কমিটির খসড়া তৈরি করেন।

সেই খবরটি পৌঁছায় কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সবুজের কানে। তারপর ১০-১২ জনের দল নিয়ে সন্ধ্যায় উপস্থিত হন কলেজে, ডেকে পাঠানো হয় কিবরিয়াকে।

কলেজে কর্মচারীদের নিয়ে করা কমিটি তৈরির আগে কেন সবুজের মতামত নেওয়া হলো না, কেন নিজের পছন্দের কর্মচারীদের কমিটিতে রাখা হলো না, সেই অপরাধেই কিবরিয়ার ওপর চড়াও হন সবুজ।

এমনকি কিবরিয়া বেয়াদবি করেছে জানিয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ বরাবরে বিচারও দেন সবুজ। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ হয়ে যায় কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের কমিটি গঠন। শেষ পর্যন্ত সেই কমিটি গঠন করা হয় চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি।

ঘটনার পর কিবরিয়া ও অন্য কর্মচারীরা বিচার নিয়ে যান কলেজ অধ্যক্ষের কাছে। পরে সবুজকে দিয়ে ‘সরি’ বলানোর পর বিষয়টি মীমাংসা করিয়ে দেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী।

শুধু কিবরিয়া নন, কলেজে ছাত্রলীগ নেতাদের লাঞ্ছনার মুখে পড়েছেন অন্তত অর্ধ ডজনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ।

এ বিষয়ে অধ্যক্ষ মো. মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ওদের (কর্মচারী) এখানে চাকরি করতে হবে, আর ওরা এখানে রাজনীতি করে। কর্মচারীরা কি ওদের সঙ্গে ঝামেলা করে থাকতে পারবে, বলেন?’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, ওরা (কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদ ও সম্পাদক সবুজ) তো ওদের কর্মফল ভোগ করছে। এই বিষয়ে আর কিছু বলার আগ্রহও নেই। যেহেতু সে প্রধান অফিস সহকারী, তার একটা মান-সম্মান আছে। এই ঘটনায় ওর সম্মানহানি ঘটছে। পরে যখন ওরা মাপ চাইছে, বিষয়টা মীমাংসা করে দিয়েছি।’

এদিকে কলেজে সরকারি কর্মচারী রয়েছে ৩৯ জন ও বেসরকারি ৮৩ জন। মোট ১২২ জন কর্মচারীর প্রায় সবাই জিম্মি ছাত্রলীগের কাছে। অধ্যক্ষ বলেন, ‘এরকম টুকটাক ঝামেলা তো হয়েছেই, আবার মিলমিশ হয়ে গেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম কলেজের এক তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রী (শিক্ষামন্ত্রী) মহোদয় পর্যন্ত গিয়েছে। তিনি শুনলাম সবুজকে বকাঝকা করেছেন।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ মল্লিক সবুজ বলেন, ‘মারছি, তবে বিষয়টা ওরকম না। দু’জনের হট-টকের মধ্যে হয়ে গেছে আরকি। মন্ত্রী মহোদয় বিষয়টা মিমাংসা করে দিয়েছেন। আমি এটা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না।’

ভুক্তভোগী প্রধান অফিস সহকারী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘কর্মচারীদের জন্য একটি কমিটির রাফ করেছিলাম। সেটা সবুজের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তাই সে এটা করেছে। পরে প্রিন্সিপাল স্যার মিলিয়ে দিয়েছে, সবুজ মাপ চেয়েছিল।’

মীমাংসার বিষয়ে কিবরিয়া বলেন, ‘প্রথমে মেনে নেয়নি। পরে ভাবলাম উপরে গেলে বিষয়টা তো অনেক সমস্যা হই যাইতো। ছাত্রলীগেরও বদনাম হইতো, আমি চাই নাই ছাত্রলীগের বদনাম হোক। তাই বিষয়টা আর বাড়াই নাই, কাউরে জানাইও নাই।’

বিএস/ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!