চাকরির আড়ালে রেলে চাঁদা-ঠিকাদারির বড় বাণিজ্য জাকিরের

0

ঠিকাদারি, চাঁদা ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ রেলওয়ের পাহাড়তলী ডিসিও অফিসের প্রধান সহকারী জাকির হাসানের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রেল শ্রমিক লীগের ১০-১৫ জন কর্মীসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে কর্মচারীর বদলি বাতিল ইস্যুতে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করতে এসে তার অফিসের স্টেনোগ্রাফারকে লাঞ্ছিত করেন এই জাকির হাসান। টেন্ডারের কাজ হাতিয়ে নিতে ‘ইস্যু’ তৈরির এটি কৌশল বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় রেলওয়ে বাণিজ্যিক কার্যালয় (ডিসিও) পাহাড়তলী কার্যালয়ে স্টেনোগ্রাফার লাঞ্ছনার এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাণিজ্যিক দপ্তরের ওই স্টেনো কিবরিয়া। এ ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, টেন্ডার, ঘুষ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটিপতি হয়েছেন এই প্রধান অফিস সহকারী জাকির হাসান। ৫ লাখ টাকা ঘুষে বদলি হয়ে এসে এই পদে বসেছেন তিনি— এমন অভিযোগ রয়েছে রেলভবনে। ৭ লাখে কিনেছেন শ্রমিক লীগের পদ— কেউ কেউ তুলেছেন এমন অভিযোগও। রাজনীতিতে তিনি বিএনপি ঘরানার নেতা হিসেবে পরিচিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রেলস্টেশনের পারচেজ শাখার কর্মী হেলালুদ্দিনকে কুমিল্লায় বদলির আদেশ বাতিল করতে ২৭ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনসার আলীর কার্যালয়ে যান জাকির হাসান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন রেল শ্রমিক লীগের লোকমান অনুসারী ১০-১৫জন কর্মী। কর্মকর্তা না থাকায় তারা স্টেনো কিবরিয়াকে লাঞ্ছিত করে চলে যান। রেলওয়ে সূত্র জানায়, আনসার আলী অফিসে নেই জেনেই তারা আসেন। মুখে বদলি হলেও টেন্ডারের কাজ হাতিয়ে নিতে এই ‘ইস্যু’ তৈরি করা হয়।

১৯ ফেব্রুয়ারি পুরাতন রেলস্টেশনে এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা নিতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হন জাকির হাসান।
১৯ ফেব্রুয়ারি পুরাতন রেলস্টেশনে এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা নিতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হন জাকির হাসান।

এ ব্যাপারে জানতে জাকির হাসানের অফিসে দুপুর সাড়ে ১২টায় গিয়ে তার চেয়ার খালি পাওয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিস কর্মচারী বলেন, ‘তিনি ১ ঘণ্টাও চেয়ারে বসেন না। মাঝে মাঝে অফিসেই আসেন না।’

সূত্র জানায়, ডিসিও অফিসের প্রধান সহকারী জাকির হাসান রেলওয়ের টেন্ডার নেন স্ত্রী ও ভাইয়ের নামে। স্ত্রী শারমিন হকের নামে আফ্রান ইন্টারন্যাশনাল, ভাইয়ের নামে এ কে জে ও আবুল হোসেন নামে ঠিকাদারি সংস্থা থাকলেও সেসব আসলে তার নিজেরই। অফিস সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ কোটি টাকার কাজ নেওয়ার প্রমাণ তদন্ত করলেই বের হবে। স্ত্রী শারমিন হকের প্রতিষ্ঠানে ২০১৮ সালে সাপ্লায়ার কার্যাদেশে ২৮ লাখ টাকার কাজ নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এখানেই শেষ নয়। রেল শ্রমিক লীগের নামে চাঁদাবাজির প্রমাণও মিলেছে তার বিরুদ্ধে।

সূত্র জানিয়েছে, এছাড়াও ১৯ ফেব্রুয়ারি পুরাতন রেলস্টেশনে জামাল নামে এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা নিতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হন এই জাকির।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ঠিকাদার জামাল বলেন, ‘মেরামতের একটি কাজের বিপরীতে জাকিরকে শ্রমিক লীগের নামে কমিশন দিতে হবে— এমন কথা জানালে তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। পরে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়।’ এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড চট্টগ্রাম প্রতিদিনের হাতে এসেছে। সেখানে যে স্বর শোনা গেছে, সেটি তার বলে স্বীকার করেছেন জাকির হাসান। তবে এই বিষয়ে প্রতিবেদকের সাথে পরে সামনাসামনি কথা বলবেন জানিয়ে ফোন রেখে দেন।

বড়তাকিয়ার প্রাক্তন স্টেশন মাস্টার আবদুল বাতেন ও সিসিএফআই গার্ড রফিকুল ইসলাম বলেন, ফায়ার সার্ভিস ছাড়পত্র নিতে জাকিরকে ১ হাজার টাকা ঘুষ দেন তারা। সবার জন্যই এক রেট, ঘুষ দিলে ছাড়পত্র মেলে।

অফিস কর্মচারী বলেন, ‘তিনি ১ ঘণ্টাও চেয়ারে বসেন না। মাঝে মাঝে অফিসেই আসেন না।’
অফিস কর্মচারী বলেন, ‘তিনি ১ ঘণ্টাও চেয়ারে বসেন না। মাঝে মাঝে অফিসেই আসেন না।’

বিএনপির রাজনীতি করা জাকির হাসান কিভাবে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সহ-দপ্তর সম্পাদক পদ পান— এমন প্রশ্ন তুলেছেন ওই শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

৭ লাখে দলীয় পদ বেচাকেনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় রেল শ্রমিক লীগের সভাপতি হুমায়ূন কবিরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি পদ বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত অপকর্ম দল বহন করবে না। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনসার আলীর মুঠোফোনে কল ও এসএমএস করা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।

এসএস/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm