চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ মাঠকে ‘উন্মুক্ত স্থান’ হিসাবে সংরক্ষণের দাবিতে স্মারকলিপি

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ সংলগ্ন মাঠে কোনো স্থাপনা তৈরি না করে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নেতৃবৃন্দ।

বুধবার (১২ জুন) চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে এ দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনটি। এ সময় নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ সংলগ্ন অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত শিশু পার্কটি উন্মুক্ত স্থান হিসাবে সংরক্ষণ করার আহ্বান জানান।

স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন, প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া শিল্পী শাহরিয়ার খালেদ ও পরিবেশবিদ তাসলিমা মুনা।

শুরুতেই পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণটি উদ্ধার ও অবমুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসককে সাধুবাদ জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ এবং তদসংলগ্ন উন্মুক্ত বিস্তীর্ণ (প্রায় ৩.৮৯ একর) প্রাঙ্গণ যুগ যুগ ধরে নগরবাসীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে একটি উন্মুক্ত নাগরিক কেন্দ্রের সুবিধা দিয়ে এসেছে। চত্বর সংলগ্ন বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থার দপ্তর ও সাবেক বিভাগীয় স্টেডিয়ামের অবস্থান থাকায় এলাকাটি কিশোর-তরুণদের খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। সার্কিট হাউজ ও স্টেডিয়াম এলাকা ঘিরে চট্টগ্রামে যে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তা ১৯৯৩ সালের এক অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ফলে ধ্বংস হয়ে যায়। আমরা মনে করি সম্প্রতি উদ্ধারকৃত স্থানটিকে আবারো পূর্বেকার মতো প্রাকৃতিক সবুজ উদ্যান তথা, চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটি সার্বজনীন মুক্ত ময়দানে পরিণত করার প্রয়োজন।

এতে আরও বলা হয়, উন্মুক্ত স্থান আধুনিক নগরজীবনের আবশ্যিক চাহিদা। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্নয়নের ফলে শহরে মুক্তাঙ্গন ক্রমেই দুর্লভ হয়ে পড়েছে। যেখানে ইউরোপের বার্সেলোনায়, ১০১.৯ বর্গ কি.মি আয়তন ও ৫৪.৭ লক্ষ জনসংখ্যার বিপরীতে মাথাপিছু উন্মুক্ত স্থান রয়েছে ৫.৬ ব.মি, এবং প্রতিবেশী দেশ কলকাতায় ১৮৭ বর্গ কি.মি আয়তন ও ৪৬.০ লক্ষ জনসংখ্যার বিপরীতে মাথাপিছু উন্মুক্ত স্থান আছে ০.৬৭ ব.মি, সেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলে খ্যাত ১৬৮.১ বর্গ কিমি আয়তনের চট্টগ্রামে ৫২ লক্ষ জনসংখ্যার বিপরীতে উন্মুক্ত স্থান আছে মাত্র ০.১৮ ব.মি। সেই হাতে গোনা অল্প কটি উন্মুক্ত স্থানও বারংবার নানা অপরিকল্পিত ও অপউন্নয়নে বিনষ্ট হবার সন্মুখীন হচ্ছে।

এই বাস্তবতায়, সার্কিট হাউজ চত্বরকে টেকসই উন্নয়ন রীতি অনুসরণ করে একটি উন্মুক্ত নাগরিক কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার অনুরোধ জানিয়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নেতৃবৃন্দ যেসব বিষয়ে আলোকপাত করেন, সেগুলো হচ্ছে—

ক. চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য ১৯৬১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রণীত সবগুলো পরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনায় (সংযুক্তি-২) উন্মুক্ত পরিসরের পরিধি বাড়ানো ও এর যথাযথ সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। সার্কিট হাউজের সন্মুখস্ত চত্বরটি প্রকৃতপক্ষে সার্কিট হাউজের মহাপরিকল্পনারই অনুষঙ্গ। এটি চট্টগ্রামের একটি ল্যান্ডমার্ক হিসেবেও গণ্য। তাই, সঙ্গত কারণেই সার্কিট হাউজের ঐতিহ্য রক্ষার্থে এই ঐতিহাসিক চত্বরে কোনরকম বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ না করে এটি উন্মুক্ত ভাবে সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যকীয়। অতএব, চট্টগ্রাম মহানগরীর মাস্টারপ্ল্যানে উন্মুক্ত পরিসর হিসাবে চিহ্নিত স্থানগুলোতে যেন বিধি বহির্ভূতভাবে অন্য ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা না হয় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদানের অনুরোধ জানাচ্ছি।

খ. নগরজীবনে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত আলো, হাওয়া সমৃদ্ধ সবুজ মুক্তাঙ্গন, যেমনঃ উদ্যান, খেলার মাঠ, পাহাড়, জলাশয় ইত্যাদি আবশ্যক। কারণ, উদ্যান, জলাশয়সহ সকল উন্মুক্ত স্থান তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ু দূষণ ও নগর বন্যার রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভুমিকা পালন করে। সেই বিচারেও সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণসহ চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা উন্মুক্ত পরিসরগুলোকে সংরক্ষণ করা জরুরি বলে আমরা মনে করি।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম, চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং নাগরিক সুযোগ সুবিধার সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশের স্বার্থে এর জন্মলগ্ন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও সার্কিট হাউজের উন্মুক্ত চত্বর সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের স্বার্থে যে কোন বিষয়ে ফোরাম পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করতে প্রস্তুত রয়েছে।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!