চট্টগ্রাম রেলে বেপরোয়া আরএনবি জড়াচ্ছে অপরাধে

চুরি থেকে কালোবাজারি, নিয়োগবাণিজ্য থেকে যাত্রী হেনস্তা

চট্টগ্রামসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা। যন্ত্রাংশ চুরি, তেল চুরি, অশোভন আচরণ, টিকিট কালোবাজারি, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ যাত্রীদের মারধরের মতো ঘটনায়ও জড়িয়ে পড়ছে আরএনবির সদস্যরা। এসব অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ায় আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত টাকার লোভে সিপাহী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িয়ে পড়ছেন এসব অপরাধে।

বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে আরএনবি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়লেও তার কোনো বিচার হয়নি। বরং তাদের বহাল তবিয়তে রেখে অনেকটা ‘পুরস্কৃত’ই করেছেন কর্তারা। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর টনক নড়েনি তাদের। সর্বশেষ চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে এক সেনাসদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ।

টিকিট কালোবাজারি

ট্রেনের টিকিট কালোবাজারিতে জড়িত থাকায় গত ৩ জুলাই চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে আরএনবির হাবিলদার মো. রবিউল ইসলাম ও সিপাহি মো. ইমরান নামের দুই সদস্যকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

এ ঘটনায় জড়িতদের বদলি করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে তবে টিকিট কালোবাজারি ঘটনায় আরএনবির সিআই সালাম উল্লাহকে বদলি করা হয়।

Yakub Group

রেলের তেল চুরি

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের রেলওয়ের সিজিপিওয়াই (চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড) লোকোশেডে দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির অভিযোগ পেয়ে গত ৩ মার্চ রেলওয়ে কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে তেল চুরির অপরাধে আরএনবির একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া  হয়। তবে দুদক তাদের নাম জানায়নি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের মে মাসে লোকোশেডে জ্বালানি মজুদ ছিল দুই হাজার ২৪ লিটার। কিন্তু কোনো মজুদ নেই দেখিয়ে চাহিদাপত্র দেন লোকোশেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে গত বছরের জানুয়ারি মাসে এক হাজার ৯৬০ লিটার মজুদ থাকলেও এক হাজার ৮০০ লিটার মজুদ দেখিয়ে চাহিদাপত্র দেন তারা। এভাবে বছরের পর বছর তেল চুরি করে আসছিলেন তারা।

সেনাসদস্যকে মারধর

চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে সেনা সদস্যকে মারধরের ঘটনায় তিন আরএনবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা করে র‌্যাব।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ আগস্ট রাতে ১০টায় ট্রেনে ওঠার সময় সেনাসদস্যকে বাধা দেয় আরএনবি সদস্যরা। টিকিট থাকার পরও এ সময় তারা অতিরিক্ত ৩০০ টাকা দাবি করে ওই সেনাসদস্যের কাছ থেকে। টাকা না দিয়ে আরএনবি সদস্যদের এসব কথা ভিডিও করতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে সেনাসদস্যকে মারধর ও গালিগালাজ করতে থাকে আরএনবির সদস্যরা।

এক অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিকের করা এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ২৫ আগস্ট যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে আরএনবির তিন সদস্যকে আটক করে আটকরা হলেন মাইন হাসান রাকিব (২৩), রিটন চাকমা (২৪) ও রবিউল ইসলাম (৩০)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দোষ স্বীকার করেছেন।

কিন্তু এমন ঘটনার ১৫ দিন পরও এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আরএনবি কর্তৃপক্ষ।

বাহিনীর খাতায় জিডি এন্ট্রি হওয়ার পরও কিভাবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ঘটনা জানেন না— এ বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (পূর্ব) কমান্ড্যান্ট রেজওয়ানুর ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি জানানো হয়নি আমাকে।’

চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামও বলেন, ‘হামলার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি।’

আটক ব্যক্তিকে মারধর করে মিথ্যা সাক্ষী আদায়

চলতি বছরের ১৯ ও ২০ মার্চ চুরির ঘটনায় আটক আসামিদের মারধরের অভিযোগ ওঠে আরএনবির সদস্যদের বিরুদ্ধে। চুরির অভিযোগ এনে এক ব্যক্তিকে মেরে মিথ্যা জবানবন্দি নেয় আরএনবি।

রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় বিভিন্ন সময় কয়েকজন আটক হলেও এসব কাজের পেছনে কিছু অসাধু আরএনবি সদস্যও জড়িত বলে জানা গেছে। চুরি করা যন্ত্রাংশ বিক্রির পর সেই টাকার ভাগ ওইসব আরএনবি সদস্যরাও পান—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নিয়োগ দুর্নীতি

২০১৭ রেলে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) নিয়োগ দুনীতিতে দুদক মামলা দায়ের করেন। পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামসহ ৫ জনকে আসামি করে ২৮ আগস্ট দুদক মামলা দায়ের করে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের আরএনবির সিপাহী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১৮৫ জন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অবৈধভাবে ক্ষমতা অপব্যবহার করে পোষ্য ও মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থীদের অনুত্তীর্ণ করা হয়। সেখানে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়। একইভাবে ওই নিয়োগের বিভাগীয় কোটা, জেলা কোটা ও অন্যান্য কোটাও মানা হয়নি।

ওই নিয়োগে অন্তত ৭৮ জন কোটা প্রার্থীর সঙ্গে এই অন্যায় আচরণ করা হয়। ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারাসহ দন্ডবিধি ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয় পাঁচজনের বিরুদ্ধে।

সিআরবিতে চাঁদাবাজি

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের সদরদপ্তর সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকায় ভাসমান দোকান থেকে চাঁদা নেওয়া অভিযোগ পাওয়া গেছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সিপাহী জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তার সহযোগী হিসেবে আছেন আরএনবির অবসরপ্রাপ্ত সদস্য হারুন। এ দুজনের অপকর্মের পেছনে আরএনবির চিফ ইন্সপেক্টর (সিআই) মাসুদুর রহমান রয়েছেন বলে জানা গেছে। জসিম তার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। নিয়ম বহির্ভূতভাবে সিআরবিতে ডিউটি বণ্টনের দায়িত্বও জসিমকে দিয়েছেন সিআই মাসুদুর। এই জসিমের বিরুদ্ধে সিআরবিতে দর্শনার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও আছে।

অভিযোগ আছে, সিআরবি ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা চাঁদা তোলেন জসিম ও হারুন। সিআরবি এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকান প্রতি দৈনিক ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়। আবার এসব দোকান থেকে নেওয়া হয় এককালীন এডভান্সও। এছাড়া কদমতলী সিএনজি পাম্পের পেছনের গলিতে দিন-রাত যেসব পণ্যবাহী ট্রাক মালামাল আনলোড করে তাদের কাছ থেকে গাড়িভেদে নেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। একইসঙ্গে বিভিন্ন টং দোকানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েও এককালীন টাকা ছাড়াও মাসে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা আদায় করেন তারা।

রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আরএনবির এসব কর্মকর্তার চাঁদাবাজির বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবো। গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগের বিষয়ে চিফ কমান্ড্যান্টকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’

তবে এক্ষেত্রেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আরএনবি কর্তৃপক্ষ।

ডিজে/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm