চট্টগ্রাম রেলে চাকরির নামে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা দুই কর্মচারী
৮ মাস অনুপস্থিত কর্মস্থলে, ব্যবস্থা নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে চাকরি দেওয়ার নামে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন। ফলে ভুক্তভোগীরা বারবার অফিসে ধর্ণা দিয়েও টাকা আদায় করতে পারছেন না। এ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরাবরে অন্তত ২০টিরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরির প্রলোভনে টাকা মেরে দিয়ে তারা আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন দুই কর্মচারী। রেলের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেছেন তারা।
তবে রেলওয়ে বলছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। শিগগরিই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেলের দুই কর্মচারী হলেন—মোহাম্মদ হোসাইন ও কামরুল ইসলাম। তারা পাহাড়তলীর সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরে (পূর্ব) কর্মরত আছেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে গিয়ে দেখা গেছে, অফিসে উপস্থিত নেই মোহাম্মদ হোসাইন ও কামরুল ইসলাম। দপ্তরে শিপিং ও পরিদর্শন বিভাগে ম্যাটেরিয়াল চেকার পদের কর্মরত এই দুইজন যথাক্রমে ৮ মাস এবং ৩ মাস যাবৎ কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
দপ্তরের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের নামে কয়েকটি মামলা আছে। পাওনাদাররা প্রায় অফিসে আছেন। এছাড়া পুলিশও তাদের খোঁজে আসে। মামলা ছাড়াও তাদের নামে অন্তত ২০ জন ভুক্তভোগী টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযোগ দিয়েছেন। চাকরির নামে এদের কাছ থেকে তিন লাখ থেকে শুরু করে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। এরপরও তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
জানা গেছে, চাকরির নামে অর্ধকোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন তারা। ছুটি না নিয়েই ৮ মাসের বেশি সময় ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত হোসাইন। সৈয়দপুর, কেলোকা, পার্বতীপুর, রাজশাহী, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের অনেক রেল কর্মচারী ও তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়েছেন তিনি। আরএনবি এক হাবিলদার তার আত্মীয়ের চাকরির জন্য হোসাইনকে ৯ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। গত ২৬ এপ্রিল দপ্তরে এসে দুইজন পাওনাদার ১৫ লাখ টাকা পাবেন বলে জানান। তারা সঙ্গে প্রমাণপত্রও নিয়ে আসেন।
হোসাইনের স্ত্রী ভাটিয়ারীতে পয়েন্টসম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। কিন্তু তার বদলি হয়ে যাওয়ায় এখন তাদের আর খোঁজ পাচ্ছে না পাওনাদাররা।
৩ বছর আগে চাকরির নামে হোসাইনকে টাকা দিয়ে প্রতারণা শিকার হন—মো. সিরাজুল ইসলাম, নূর আলম ও মো. আব্দুর রাজ্জাক সুমন নামে তিন যুবক। তারা লিখিতভাবে এ বিষয়ে অভিযোগ দেন রেলের জিএম’র (পূর্ব) দপ্তরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরএনবির ওই হাবিলদার জানান, আত্মীয়ের চাকরির জন্য ৯ লাখ টাকা নিয়েছে হোসাইন। ৫ বছর ধরে ধর্ণা দিয়েও সেই টাকা মিলছে না।
অভিযোগ রয়েছে, টাকা মেরে দিয়ে চট্টগ্রাম নগরের আলকরণ এলাকায় চার গন্ড জমি কিনেছেন হোসাইন। একইসঙ্গে কোতোয়ালীতে ‘আমির এন্টারপ্রাইজ’ এবং আগ্রাবাদ চৌমুহনীর কর্ণফুলী মার্কেটে চারটি দোকানও রয়েছে তার। এছাড়া সদরঘাট রোডে ‘আমিন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, বিটিএল লুব্রিকেন্টস্ ও ঈগলু আইসক্রিমে’ ডিলারশিপ আছে তার।
আরও জানা গেছে, অপরজন কামরুল ছুটির দরখাস্ত ছাড়াই ৩ মাস ধরে অফিসে আসছেন না। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী চেরাগ আলী নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে তার ছেলের বদলির জন্য মোটা অংকের টাকা নিয়ে তিনি পালিয়ে যান। এছাড়া তিনি ঈদযাত্রার টিকিট ম্যানেজ করে দিবেন বলে ১০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে গ্রহণ করে টিকিট না দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে দেন বলে জানান তার এক সহকর্মী। একই দপ্তরের এক নারী কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন কামরুল। এছাড়া এনআইডি সংশোধন, চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. হোসাইন ও কামরুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করলেও সাড়া মেলেনি। পরে তাদের ক্ষুদেবার্তা পাঠালে কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পরিদর্শন) এসএম আল মুহিদ বলেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। দ্রুত কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
ডিজে




