চট্টগ্রাম মেডিকেল ‘খালি’ করে ১৫৬ ডাক্তারকে গণবদলি, অনিশ্চয়তার মুখে ২ হাজার রোগী

স্বাস্থ্যের আমলাদের ‘খেয়ালখুশির বদলি’ নিয়ে হঠাৎ অস্থিরতা

বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে একযোগে বদলি করা হয়েছে ১৫৬ জন চিকিৎসককে— যাদের বেশিরভাগই নিজ নিজে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের চিকিৎসক। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা ইউনিট ছাড়াও জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে বলা হয়েছে। অথচ শুধুমাত্র চমেক হাসপাতালেই এই মুহূর্তে বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে দুই হাজারেরও বেশি রোগী— যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বিচারে এমন গণবদলিতে বিপুলসংখ্যক এইসব রোগী ছাড়াও প্রতিদিন আসা আরও বিপুল রোগী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। চিকিৎসক নেতারা বলছেন, এমন গণবদলি চিকিৎসাব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

এমন নির্বিচার গণবদলিকে স্বাস্থ্য বিভাগের আমলাদের ‘খেয়ালখুশি’ হিসেবে অভিহিত করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল বর্তমানে ডাক্তারের সংখ্যা তুলনামূলক পর্যাপ্ত থাকলেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) থেকে সেখানে বদলি করা হয়েছে ৬০ জন ডাক্তারকে। অথচ তার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফেনীর দাগনভুঁইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়েছে ৭ জন ডাক্তারকে। আর ফেনী জেলা হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে ২৪ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) থেকে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও আটজন ডাক্তারকে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে খাগড়াছড়ি জেলা হাসপাতাল বদলি করা হয়েছে ১৮ জন ডাক্তারকে। ফৌজদারহাটের ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালেও বদলি করা হয়েছে ১৬ জনকে। এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে ৩০ জন ডাক্তারকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণবদলির আদেশটি অনেকগুলো অস্বাভাবিক নজির তৈরি করেছে। যেমন কোনো সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপককে মেডিকেল কলেজের বাইরে কোন জেলা হাসপাতালে বদলির ঘটনা সম্ভবত এর আগে ঘটেনি। অথচ দাগনভূঁইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মতো জায়গায় বদলি করা হয়েছে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে।

এ আদেশে যাদের বদলি করা হয়েছে তাদের প্রায় সকলেই স্ব- স্ব বিভাগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ। প্রশ্ন উঠেছে, কোভিড চিকিৎসা দিতে প্যাথলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, নিউরোসার্জন, জেনারেল সার্জন, দন্তরোগ, চক্ষুরোগ, নাক-কান ও গলা রোগ, শিশুরোগ ইত্যাদি সব বিশেষজ্ঞদের ভুমিকা কী? উপজেলা বা সদর হাসপাতালে এসব বিশেষজ্ঞ শিক্ষক- চিকিৎসকের ভূমিকাইবা কী হবে— এ প্রশ্নও উঠেছে।

ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে শ’খানেক করোনা রোগী চিকিৎসার জন্য ভর্তি থাকেন। এ হাসপাতালটি তাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার বা সহকারী সার্জন নিয়ে গত ১৫ মাস ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে কোনো অভিযোগ ছাড়াই। ওই হাসপাতালে আরো ৬০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বদলি করে পাঠানোর প্রয়োজনই ছিল না। একইভাবে বিআইটিআইডিতে আরও ১৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাজ কী হবে— উঠেছে সেই প্রশ্নও।

জানা গেছে, ২৮ নং নিউরো সার্জারি ওয়ার্ড থেকে তিনজন চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। এ ওয়ার্ডে চিকিৎসকই আছেন মাত্র ৫ জন। নিউরোসার্জারি ওয়ার্ড বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নত চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল। এ ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি থাকে ১৫০ থেকে ২০০ জন। এতগুলো রোগীকে রেখে সহযোগী ও সহকারী পদবির তিন অধ্যাপককে বদলী করলে ওই ওয়ার্ডের চিকিৎসাব্যবস্থা পড়বে হুমকির মুখে।

নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডের সহকারী অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি নিউরোসার্জারির ডাক্তার। মস্তিস্কের অপারেশন, জটিল ক্রিয়াকলাপের চিকিৎসার সাথে যুক্ত। করোনা একটি বিশেষায়িত রোগ। আমাকে দিয়ে আসলে করোনার কী বিশেষ চিকিৎসা মিলবে, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘যেসব চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগই ওএসডি বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ওএসডি থেকে পদোন্নতি পেয়ে আমরা বর্তমান অবস্থানে রয়েছি। কিছু বিবেচনা না করেই গড়হারে এ বদলি করা হয়েছে বলে জানান ডা. রবিউল। নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে সপ্তাহে তিনদিন জটিল অপারেশন থাকে। প্রতিদিন থাকে নতুন রোগী ভর্তি।

ডা. শাহানা গাইনী ওয়ার্ডে কর্মরত। তাকে বদলি করা হয়েছে ফেনীর দাগনভুঁইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘গাইনী ৩১, ৩৩, ৩৪ নির্দিষ্ট সিটের বিপরীতে প্রায় ৩ গুণ রোগী ভর্তি থাকে। গাইনী ওয়ার্ডে চিকিৎসক সংকট ওয়ার্ডটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। বর্তমানে যে কজন সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন, সেখান থেকে প্রায় ৫ জনকে বদলি করা হয়েছে। এ ওয়ার্ড কিভাবে চলবে তার দিকে খেয়াল রাখা হয়নি।’

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মিনহাজুর রহমান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০ জন কোভিড রোগী ভর্তি থাকে। আর নন-কোভিড রোগী ভর্তি আছে ২ হাজার। এতগুলো ডাক্তারকে একযোগে বদলি করা যে হলো, তাহলে এতগুলো নন-কোভিড রোগীর চিকিৎসা কে দেবে?’

তিনি বলেন, ‘শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ৩ জন সহকারী অধ্যাপক ছাড়া সব ডাক্তারকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। প্যাথলজি থেকে ডা. সাবরিনা শারমীন, মো. ইসমাইলসহ আরো কয়েকজন চিকিৎসককে ফেনী জেলা হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। এসব ডাক্তার ফেনীত গিয়ে কী করবেন? কার্ডিওলজি বিভাগ থেকে ৫ জন চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। এ ওয়ার্ড কিভাবে চলবে তা একবারও ভেবে দেখা হয়নি। দন্ত বিশেষজ্ঞকে বদলি করা হয়েছে। কোভিডের চিকিৎসায় দন্ত বিশেষজ্ঞের কাজ কী? গাইনি ও অবস প্রায় ফাঁকা করে ফেলা হয়েছে। এত বড় ওয়ার্ড কিভাবে চলবে তা ভাবা হয়নি। নিউরা সার্জারি থেকে ৩ জনকে বদলি করা হয়েছে। ৩ জনই সহযোগী ও সহকারী পদবির অধ্যাপক। তাদের ছাড়া কিভাবে চলবে নিউরোসার্জারি ওয়ার্ড?’

ডা. মিনহাজ বলেন, ‘এ গণবদলির কারণে চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটে পড়ে যাবে, এ বিভাগগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন,এ হাসপাতাল গড়ে দুই হাজার নন-কোভিড রোগীর ভার বহন করে চলে প্রতিদিন।দেড়শ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তাৎক্ষণিক বদলিতে এসব রোগীদের দূর্ভোগ এড়ানোর কোন পথ খোলা থাকবে না। হাসপাতালে নন-কোভিড রোগীর মৃত্যুহার কিন্তু কোভিড রোগীর মৃত্যুহারের চেয়ে কম নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোতে মূলত প্রয়োজন আইসিইউতে কাজ করেন এমন চিকিৎসক এবং কিছু মেডিকেল অফিসার। অথচ এটা অনুধাবন না করেই এমন গণবদলিতে আমলাগণ দায় এড়ানোর পথ খুঁজেছেন মাত্র। এতে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, সংকটই বাড়তে পারে শুধু।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!