চট্টগ্রাম মেডিকেলে ৭ কোটির লিফটে ‘যমের ভয়’ প্রতিদিন, বছরে মেরামতিতেই যায় অর্ধকোটি

চট্টগ্রাম মেডিকেলের আউটডোর থেকে গত বুধবার (৩ জুলাই) টিকিট নিয়ে সাততলায় ডাক্তার দেখানোর জন্য লিফটে উঠেন আবু রায়হান দম্পতি। এনসিলারি ভবনের ১৪ নম্বর লিফটে ওঠার পরপরই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি লোক ওঠায় লিফট চালু হচ্ছিল না। ভেতরে কোনো লিফট অপারেটরও ছিল না। পরে কিছু লোক নেমে যাওয়ার পর লিফট চালু হলেও তিনতলায় ওঠার পর লিফটটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আচমকা চালু হয়ে লিফটটি আবার নিচে নামতে থাকে। এরপর আবার ওপরে উঠতে থাকে। এভাবে চলতে থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ভেতরে লিফট অপারেটর ও জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর না থাকায় রোগীরা কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। পরে লিফটটি আটতলায় গিয়ে খুলে যায়। রোগীরা বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন। আক্ষেপ করে আবু রায়হান দম্পতি বলেন, সরকারি মেডিকেলে সেবা নিতে এসে প্রাণটাই চলে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। আল্লাহর অশেষ কৃপায় বেঁচে গেছি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ কোটি টাকায় কেনা ১৬টি লিফট পরিণত হয়েছে রীতিমতো মরণফাঁদে। প্রতি মাসেই এসব লিফটের সার্ভিসিং ও যন্ত্রাংশ কেনাবাবদ খরচ হয় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা—বছর শেষে যা দাঁড়ায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। অথচ গত কয়েক মাসে বহুবার এসব লিফটে আটকা পড়েছেন হাসপাতালের ডাক্তার, কর্মকর্তা, কর্মচারী, নার্স, রোগী ও তাদের স্বজনরা। পুরনো ও জরাজীর্ণ এসব লিফটের অনেকগুলোর দরজা খুলতে হয় ধাক্কা দিয়ে, কোনোটি আবার কাঁপতে থাকে অস্বাভাবিকভাবে। অনেক লিফটেরই সংকেত চিহ্নগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লিফটে ওঠানামা করতে হয় আন্দাজের ওপর ভর করে। এদিকে লিফট অপারেটরদের স্বেচ্ছাচারিতাকে দমানোর যেন কেউ নেই। তাদের কেউ কেউ ডিউটি ফেলে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, অনেকে আবার ডিউটিতেই আসে না।

লিফটের হাল বেহাল

চট্টগ্রাম মেডিকেলের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি) বা গণপূর্ত শাখার ইলেকট্রো মেকানিক্যাল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেলের পূর্ব গেটে চারটি লিফট রয়েছে। এর মধ্যে একটি ডাক্তারদের জন্য নির্ধারিত। বাকি তিনটি রোগী, হাসপাতালের স্টাফ, নার্স ও দর্শনার্থীদের জন্য বরাদ্দ। চারটি লিফটই ‘সচল’ রয়েছে।

পিডব্লিউডি চট্টগ্রামের ই/এম ডিভিশন -২ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে জানান, মেডিকেলের মেইনগেটে দুটি লিফটের মধ্যে একটি সচল। তবে ডাক্তারদের জন্য নির্ধারিত লিফটটি অচল রয়েছে। পশ্চিম গেটে চারটি লিফটের চারটিই সচল আছে। এর মধ্যে একটি ডাক্তারদের জন্য নির্ধারিত। এনসিলারি ভবনের চারটি লিফটের মধ্যে সবকটিই সচল। একটি লিফট মেডিকেল পরিচালকের জন্য নির্ধারিত এবং অন্যটি রোগীর জন্য। কার্ডিয়াক বিল্ডিংয়ের দুটি লিফটই সচল রয়েছে।

তিনি জানান, প্রতিটি লিফট সকাল ও বিকাল দুই শিফটে চালু থাকে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে। তবে বিকেলের শিফটে সব লিফট চলে না। কারণ তখন রোগী থাকে না বহির্বিভাগে। বিকেলে পূর্ব গেটে চারটি লিফটের মধ্যে তিনটি চলে। মাঝখানের সিঁড়িতে দুটি চলে। পশ্চিম সিঁড়িতে তিনটি চলে ও একটি বন্ধ থাকে। এনসিলারি ভবনে বিকেলে চলে তিনটি। কার্ডিয়াক বিল্ডিংয়ে চলে একটি। রাতে পূর্ব গেটে শুধু একটি লিফট চলে। ১১টার পর থেকে এই একটি লিফটই চালু থাকে পূর্ব গেটে।

৪১ লাখ টাকায় কেনা একেকটি লিফট

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেলের প্রতিটি লিফটের দাম পড়েছে ৪১ লাখ টাকা করে। এ হিসেবে ১৬টি লিফটের দাম পড়েছে ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

জানা গেছে, পুরনো লিফটগুলো এরই মধ্যে ১৫ থেকে ২০ বছর পার করে ফেলেছে। এগুলো এখন মেরামত করে করে চালানো হচ্ছে। আর বাকিগুলো আরও ২০ থেকে ২৫ বছর চালানো যাবে বলে জানান মোর্শেদুল আলম চৌধুরী। এর মধ্যে এনসিলারি ভবনের লিফটগুলো ২০২০-২১ অর্থবছরে কেনা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রতি মাসে মেডিকেলের লিফটগুলোতে একবার সার্ভিসিং ও সিএলআইটির (ক্লিনিং, লুব্রিকেশন, ইন্সপেকশন, টেস্টিং) প্রয়োজন পড়ে। প্রতিমাসে সিএলআইটি বাবদ খরচ আসে তিন থেকে চার লাখ টাকা— বছর শেষে এই অংক দাঁড়ায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

কিন্তু মাসে মাসে এই বিপুল টাকা খরচের পরও এসব লিফট এখন রীতিমতো মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেডিকেলের ডাক্তার, নার্স, স্টাফ, রোগী ও তাদের স্বজনরা মাঝে মাঝেই আটকা পড়েন লিফটে। এনসিলারি বিল্ডিংয়ে পরিচলকের জন্য বরাদ্দ লিফটের পাশের লিফটে গত সপ্তাহে আটকা পড়েন মেডিকেলের একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ রোগী ও তাদের স্বজনরা। সর্বশেষ গত ৩ জুলাই এনসিলারি ভবনের লিফটে আটকা পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। একইদিন বেশ কয়েকবার লিফট আটকা পড়লে সেখানে কোন লিফট অপারেটরদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

সব লিফটেরই করুণ দশা

সরেজমিনে দেখা গেছে, লিফটগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। মেডিকেলের পূর্ব গেটে ২ নম্বর লিফট এতোটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে যে, লিফটের দরজা বেশিরভাগ সময় ধাক্কা দিয়ে খুলতে হয়। চালুর পর বিপজ্জনকভাবে কাঁপতে থাকে লিফটটি। পশ্চিম গেটের ৯ নম্বর লিফট, কার্ডিয়াকের একটি লিফটের অবস্থা খুবই করুণ।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মেডিকেলের বেশিরভাগ লিফটই চলার সময় ভয়ংকর শব্দ হয়, মাঝেমধ্যে আটকে যায়। দরজা খোলাই থাকে সচরাচর, আবার সেই দরজা বন্ধ হলে সহজে খুলতে চায় না। দেখা গেছে, মেডিকেলের মাঝের সিঁড়ির পাশে যে লিফটটি আছে, সেটির দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলতে হয়। লিফট যখন নিচ থেকে ওপরে উঠে তখন অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে থাকে। ওঠানামা ও দরজার সুইচগুলো (সেন্সর বোতাম) ঠিকমতো কাজ করে না। নিচে ও উপরে ওঠানামার জন্য চিৎকার করে অপারেটরকে ডাকতে হয়। সংকেত চিহ্নগুলোও নষ্ট। ফলে লিফটে আন্দাজমতো ওঠানামা করতে হয়। এসব লিফটের ভেতর নেই জরুরি প্রয়োজনে ফোন বা ইন্টারকমে যোগাযোগের ব্যবস্থাও।

লিফটম্যানদের স্বেচ্ছাচারিতা

জানা গেছে, মেডিকেলের ১৬টি লিফটে ৩২ জন লিফটম্যান কর্মরত রয়েছে। লিফটম্যানদের বেতনভাতা গণপূর্ত বিভাগের থোক বরাদ্দ থেকে দেওয়া হয়। এদের প্রত্যেকের বেতন ১৩ হাজার টাকা করে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ১৬টি লিফটের কোনোটিতেই লিফট অপারেটররা নিয়মিত ডিউটি পালন করেন না। দিনের বেশিরভাগ সময় লিফটম্যানরা ভেতরে অবস্থান করে লিফট পরিচালনা করেন না। সাধারণ দর্শনার্থীরাই লিফটের বোতাম চেপে ওপরে-নিচে ওঠানামা করে থাকেন।

বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) বিকেল পৌনে চারটায় সরেজমিন মেডিকেলে গিয়ে বেশিরভাগ লিফট অপারেটরদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। ব্লক বি এর লিফট ৮-এ লিফট অপারেটর ছিল না। একই ব্লকের লিফট ৯-এর অবস্থা ও ছিল একই। ছিল না লিফট অপারেটর। এনসিলারি বিল্ডিংয়ে ১৪ নম্বর লিফটে অপারেটর ছিল না। ১৩ নং লিফট বিকেলে বন্ধ থাকে। আর একই ভবনের পরিচালকের লিফটের পাশে ১২ নং লিফটেও লিফট অপারেটরকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। লিফটের বোতাম টিপে ওপর-নিচে যাতায়াত করতে দেখা গেছে রোগীদের।

লিফট অপারেটরদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দায়িত্বে অবহেলা প্রসঙ্গে পিডব্লিউডি চট্টগ্রামের ই/এম ডিভিশন -২ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘ঠিকভাবে ডিউটি না করার অপরাধে লিফট অপারেটরদের চাকরিচ্যূত করা হয়েছে। করা হচ্ছে এবং হবেও।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!