চট্টগ্রাম মেডিকেলে রোগী এলেই হামলে পড়ে ওষুধ কোম্পানির লোক!

রোগী নিয়ে টানাটানি, 'ব্যবস্থাপত্রের' ছবি তোলার ধুম

0

মিরসরাইয়ের বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম দীর্ঘদিন কোমরে ব্যথা নিয়ে চলছিলেন। এ-ডাক্তার ও-ডাক্তার দেখিয়ে কোনো উপকার না হওয়ায় অবশেষে দ্বারস্থ হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগে। সকাল ৯টায় এসে দীর্ঘ সারি পেরিয়ে ১০ টাকায় টিকিট কেটে আবারও ডাক্তার দেখানোর জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হলো। অপেক্ষায় অপেক্ষায় রীতিমতো নাজেহাল হোসেন আরা বেগম। এমনিতেই কোমরে ব্যথা, তার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন ঘন্টাদেড়েক। ডাক্তার দেখিয়ে বের হতেই ভাঙা মৌমাছির চাকের মতন ৭-৮ জন লোক হুমড়ি খেয়ে পড়েন হোসেন আরা বেগমের সামনে। কিছু বুঝে উঠার আগেই হাত থেকে ‘ব্যবস্থাপত্র’ রীতিমতো কেড়ে নিয়ে হৈ হৈ করে ছবি তুলতে লাগলেন সকলে। হোসনে আরা বেগম বুঝতেই পারছেন না তার সাথে কী হচ্ছে!

কেবল যে হোসনে আরা বেগমের বেলায় এমন ঘটেছে তা নয়। ডাক্তার দেখাতে প্রতিদিনই আসা অসংখ্য রোগীদের পড়তে হয় এমন দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনায়।

বহির্বিভাগের সামনে থাকা স্যুট-টাই পরা জনাদশেক লোকের জটলা যেন গিজগিজ করছে। অসংখ্য রোগীর ভিড়ে এই গুটিকয়েক লোক মোবাইল হাতে নিয়ে তীর্থের কাকের মতন অপেক্ষা করছেন ডাক্তার দেখিয়ে কখন রোগী বের হবেন ব্যবস্থাপত্র নিয়ে। বের হওয়া মাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়বেন ছবি তোলার জন্য। মূলত তাদের কাজই হচ্ছে রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে রাখা। শুধু যে ছবি তুলেই তাদের কাজ শেষ তা কিন্তু নয়। কিন্তু কেন এই ছবি তোলা তার প্রকৃত কারণ কী? প্রকৃত পক্ষে তাদের কোম্পানির কয়টি ওষুধ ডাক্তার লিখেছেন এটা তার প্রমাণ । পরবর্তীতে নিজেদের কোম্পানির ওষুধ না লিখলে চিকিৎসকের কাছে কৈফিয়ত চাইতে দ্বিধা করেন না বিক্রয় প্রতিনিধি ও কোম্পানির এজেন্টরা।

সোয়েব খান নামের এক ব্যক্তি তার সাত মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে দেখাতে এসেছেন। রুম থেকে বের হতে না হতেই ওষুধ কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধি কেড়ে নেন তার ব্যবস্থাপত্র। তারপর ছবি তোলেন। ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধির এমন আচরণে প্রথমে ভয় পেয়ে যান। তিনি ছবি তোলার কারণ জানতে চান। তবে কী কী ওষুধ চিকিৎসক লিখেছেন তা দেখতে ছবি তুলেছি বলে জানিয়ে দেন ওই বিক্রয় প্রতিনিধি। এভাবেই প্রতিদিন রোগী ও তাদের অভিভাবকদের বিরক্ত করে চলেছে তারা।

রোগীদের অভিযোগ, রোগীরা চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধি ও তাদের এজেন্টরা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে শুরু করেন টানাহ্যাঁচড়া। আবার নিজেদের কোম্পানির ওষুধ না লিখলে চিকিৎসকের কাছে অনেকে কৈফিয়ত চাইতে দ্বিধা করেন না। একাধিক নামিদামি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি একাধিক ডাক্তারের সাথে খারাপ আচরণ করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে হাসপাতালে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

চমেক হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা কোনো আদেশ মানছেন না। তারা হাসপাতালের বাইরে ব্যাগ রেখে অনায়াসে রোগীর দর্শনার্থী সেজে ভেতরে ঢুকে পড়ছেন। আর এরই মাঝে তারা কাজ সেরে নিচ্ছেন।

তবে নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহের রবিবার এবং বুধবার দুপুর ১টার পর মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। তবে শীর্ষস্থানীয় দু-একটি ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ ছাড়া এ নিয়মনীতি কেউ মানছেন না। নানা কৌশলে সকাল ৯টায় তারা ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর বিভিন্নভাবে রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি নিতে ব্যস্ত হয়ে যায় তারা। যখন-তখন তারা দল বেঁধে ঢুকে পড়ছেন চিকিৎসকের কক্ষে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখছেন রোগীর জন্য দেয়া চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র। এ ছাড়াও ওষুধ কিনতে যাওয়া রোগীদের স্বজনদের রাস্তায় ধরে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেখছেন এবং ছবি তুলছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডাক্তার আখতারুল ইসলাম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ওদের তো শরম নাই! ওদেরকে পুলিশ দিয়ে, আনসার দিয়ে যে পরিমাণ বেইজ্জত করা হয়েছে। আর কী করবো? ওদের মোটরসাইকেলের হেলমেট নিয়ে আসা হয়েছে। তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখন লাঠিপেটা করার বাকী আছে।’

চমেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, বহির্বিভাগে সবসময় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের থাকে জটলা। চিকিৎসকদের কক্ষ থেকে রোগীরা বেরিয়ে এলেই প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করেন বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি। এতে অনেক রোগী ভয়ে আঁতকে ওঠেন।

চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দায়িত্বরত কর্মচারীরা জানান, নির্ধারিত সময়ের বাইরে চিকিৎসকের সাথে দেখা করতে তারা কখনো সাদামাটা পোশাকে আবার কখনো রোগী সেজে চেম্বারে ঢুকে পড়েন।

আগামী পর্বে
প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ছড়াছড়ি, কোম্পানির টার্গেট পূরণই মূল লক্ষ্য

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন