চট্টগ্রাম মেডিকেলে মেয়েদের রোগের অপারেশনে ‘সিরিয়ালের’ ছলনা, দেরিতে জটিল হয় রোগ

দীর্ঘ অপেক্ষায় এক রোগ থেকে ছড়ায় অন্য রোগ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে সিরিয়াল বিড়ম্বানায় পড়তে হচ্ছে স্ত্রীরোগীদের। বিভিন্ন অপারেশনের রোগী আসলেও ঠিক সময়ে তাদের অপারেশন করা হয় না। এতে তাদের রোগ আরও জটিল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যান রোগী। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে চট্টগ্রাম মেডিকেলের ৩১ নম্বর ওয়ার্ড। এমন দেরীতে অপারেশনের ফলে অনেক রোগী সেরে উঠছেন না। এজন্য এক রোগীকে তিনবারও ছুরি-কাঁচির নিচে আনতে হচ্ছে।

তবে ডাক্তাররা বলছেন, পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে রোগীদের সঠিক সময়ে অপারেশন করানো সম্ভব হয় না। এছাড়া ডাক্তারের তুলনায় রোগীর চাপ বেশি থাকাও আরেকটা কারণ। তবে ওয়ার্ডের ডাক্তারদের একাডেমিক কাজেও সময় দিতে হয়, তাই অপারেশনের তারিখ দেওয়ার পর ঠিক সময়ে অপারেশন করা সম্ভব হয় না।

জানা গেছে, চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফিস্টুলা, প্রল্যাপ্স, জরায়ুর মুখের ক্যান্সার, মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত, ইকটোপিক প্রেগন্যান্সি, ফ্রাইব্রয়েড টিউমারসহ বিভিন্ন রোগী আক্রান্ত নারীরা অপারেশনের জন্য আসেন। কিন্তু এখানে এসে তাদের সিরিয়াল বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তারিখের পর তারিখ দেওয়া হলেও অপারেশন হয় না। আবার হলেও রোগ সম্পূর্ণ সেরে ওঠে না। ফলে আবারও আসতে হয় অপরারেশন টেবিলে।

তবে ওয়ার্ডে বিশেষ পরিচিত থাকলেও অথবা ডাক্তারদের সঙ্গে সখ্যতা থাকলে নির্দিষ্ট তারিখের আগেই রোগীর অপরারেশন হয়ে যায় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগ ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এখানে শয্যা আছে ৬৪টি। কিন্তু প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ জন রোগী ভর্তি থাকে এই ওয়ার্ডে। এখানকার রোগীরা কোনো ওষুধই পান না হাসপাতাল থেকে।

ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, গত তিন মাসে যেসব অপারেশন হয়েছে, সেসব রোগীদের অনেকেই এখনও এই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন।

এই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার রাফসানা। তিনি জানান, তার প্রল্যাপ্সেরই অপারেশন করিয়েছেন দু’বার। তারপরও সমস্যার সমাধান হয়নি। আবার গত ৫ জানুয়ারি ভর্তি হয়েছেন। ডাক্তার তিনবার অপারেশনের দিন ঠিক করলেও হয়নি একবারও।

গতবছর মে মাসে তৃতীয় সন্তান বাড়িতে ডেলিভারি করাতে গিয়ে প্রস্রাবের থলি ফেটে যায় বোয়ালখালীর মনোয়ারা বেগমের। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেলে এনে সিজার করালেও তার শেষ রক্ষা হয়নি। ফিস্টুলা অপারেশনের জন্য তাকে এই ওয়ার্ডে ভর্তি করালেও তিন সপ্তাহ ধরে তার অপারেশন হয়নি। এখন তার প্রস্রাব ঝরছে অনবরত। সোমবার (৩০ জানুয়ারি) তাকে জানানো হয়, বর্তমানে মেডিকেলে ফিস্টুলা অপারেশন হচ্ছে না, তাই রিলিজ দেওয়া হয়েছে। একথা শুনে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন মনোয়ারা।

৩১ নম্বর ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, অপারেশনের জন্য সোমবার পর্যন্ত ৪২ জন রোগীর সিরিয়াল রয়েছে। কিন্তু ৪২ জনের মধ্যে পাঁচজনেরও অপারেশন সম্পন্ন সম্ভব হবে না বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইনডোর মেডিকেল অফিসার।

এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, প্রসূতি বিভাগে রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে ডাক্তাররা অপারেশনের টেবিলে সময় দিতে পারেন না। মূলত অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদবির ডাক্তাররা বেশিরভাগ সময় একাডেমিক কাজেও ব্যস্ত সময় পার করেন।

এসব ভোগান্তির পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনরা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অপারেশনের আগে রোগীদের ওষুধ কিনতে ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে তাদের।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাদিয়া নামের এক রোগীর স্বামী বেলাল হোসেন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘যা জমা টাকা-পয়সা ছিল, স্ত্রীর চিকিৎসায় খরচ করে ফেলেছি। অপারেশনের পর আরও টাকা দরকার পড়বে দেখে বাড়ির জমি বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে আসছি। এই জমিতে আমার সারা বছরের খাবার জুটতো।’

এদিকে ওয়ার্ডের একজন সিনিয়র নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইকটোপিক প্রেগন্যান্সির রোগীগুলো হাসপাতালে ভর্তি হলেও তাড়াতাড়ি তাদের অপারেশন হয় না।

কিন্তু ডাক্তারদের মতে, এই ধরনের অপারেশনে বিলম্ব হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। জরায়ুর টিউবে ইকটোপিক প্রেগন্যান্সিতে শিশু জন্ম নেয় ডিআ্যান্ডসি পূর্ববর্তী এমআর এবং ডিঅ্যান্ডসি সংক্রমণের কারণে। দ্রুত অপারেশন না করলে টিউব ফেটে গর্ভবতী মায়ের মৃত্যুও হতে পারে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা পটিয়ার রেখা আক্তার জানান, তিন-চার বছর ধরে তার তলপেটে ব্যথা হতো, রক্তক্ষরণ হতো। পরীক্ষা করে জানা গেছে, তার ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার। এজন্য অপারেশনের দিন ঠিক হয় ৫ ফেব্রুয়ারি। তবে তার গায়ে এখন জ্বর। ডাক্তার বলছে, জ্বর থাকলে অপারেশন করা যাবে না।

চট্টগ্রামের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ লুৎফুন নাহার কলি বলেন, ‘চট্টগ্রামে স্ত্রীরোগের প্রেক্ষাপট অন্যসব জেলা থেকে একটু ভিন্ন। অজ্ঞতা, কুসংস্কারের কারণে চট্টগ্রামের বেশিরভাগ নারী প্রজনন, স্বাস্থ্য ও স্ত্রীরোগকে নিয়তি হিসেবেই মেনে নেন।’

তিনি বলেন, ‘কম বয়সে বিয়ে, অধিক সন্তান নেওয়া, গর্ভোত্তর সেবার অভাব, বিলম্ব ও বাধাগ্রস্ত প্রসব, দারিদ্র্য ও কুসংস্কার, সচেতনতার অভাবে চট্টগ্রামের নারীরা চিকিৎসা নিতে গিয়ে নতুন করে অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। শুধুমাত্র অপারেশনে বিলম্ব হওয়ায় পরবর্তীতে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য জটিলতায় অপারেশন সফল হয় না।’

দেরীতে অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেলের গাইনি বিভাগের প্রধান ডা. সাহেনা আক্তার চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটারের স্বল্পতা ও চিকিৎসক সংকটই বিলম্বের কারণ। আমরা রোগীদের বিলম্ব করাতে চাই না। আসলে লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট না বাড়ালে এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব না।

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!