চট্টগ্রাম মেডিকেলে পোড়া রোগীদের দুঃসহ জীবন, ড্রেসিংয়ে ‘স্পেশাল’ আয়া-বয়, মেলে না পর্যাপ্ত ওষুধ

ওষুধ কিনতে কিনতে সর্বস্বাস্ত রোগীর স্বজনরা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বার্ন ওয়ার্ডে সংকটাপন্ন রোগীদের ডাক্তার আর নার্সদের বদলে ড্রেসিং করান ‘স্পেশাল’ বয় ও আয়া। ফলে রোগীর ক্ষত জায়গায় দ্রুত সংক্রমণ হয়। অনেক সময় কেটে ফেলতে হয় সংক্রমিত অঙ্গ। এসব বয় ও আয়াদের কেউই সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারী নন। এজন্য তারা বকশিসের নামে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা হাতিয়ে নেয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেলে পোড়া রোগীদের দুঃসহ জীবন, ড্রেসিংয়ে ‘স্পেশাল’ আয়া-বয়, মেলে না পর্যাপ্ত ওষুধ 1

এছাড়া হাসপাতাল থেকে এসব রোগীকে সব ধরনের ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও আয়া-নার্সরা রোগীর স্বজনদের দিয়ে তা বাইরের দোকান থেকে কিনেন আনেন।

‘স্পেশাল’ হিসেবে পরিচিত আয়া ও বয়দের দাবি, ওয়ার্ড থেকে তাদের ড্রেসিংয়ের বিষয়ে শেখানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন বার্ন ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধানও। তার দাবি, রোগীরা ঠিকঠাক ওষুধ পাচ্ছেন এবং তাদের ড্রেসিংও হচ্ছে নিয়ম মেনে।

চট্টগ্রাম মেডিকেলের ৩৬ নম্বর বার্ন ওয়ার্ডে ২৬ সিটের বিপরীতে মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত রোগী ভর্তি ছিল ৫০ জনেরও বেশি। চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে।

জানা গেছে, বার্ন ওয়ার্ডে আগুনে পোড়া রোগীদের প্রথমেই ড্রেসিংয়ের দরকার পড়ে। রোগী ভর্তির পর রোগীর কত শতাংশ পুড়ে গেছে, তা দেখে বোঝার চেষ্টা করেন ওয়ার্ডের দায়িত্বরত ডাক্তাররা।

এদিকে সরেজমিন বার্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডে স্পেশাল বয় ও আয়া রয়েছেন আটজন। তারাই রোগীদের ড্রেসিং করেন। প্রতি শিফটে দু’জন করে দায়িত্ব পালন করেন।

এদেরই একজন স্পেশাল বয় সমর। তিনি বলেন, ‘আমরাই রোগীদের ড্রেসিং করে থাকি। আমাদের ওয়ার্ড থেকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। আমরা সরকারি বেতনভুক্ত নই। রোগীর স্বজনরা ড্রেসিংয়ের পর খুশি হয়ে যা দেন, তাই আমরা নিই। আর ওষুধ ওয়ার্ড থেকেও দেয়। আবার আমরা রোগীর স্বজনদের ওষুধের রিকুইজিশনও দিই।’

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোগীকে ড্রেসিংয়ের পর অনেকটা জোর করে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়।

অথচ নিয়ম অনুসারে ডাক্তার ও নার্সদের দিয়েই করাতে হয় ড্রেসিং। তা নাহলে রোগীর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। আর বার্ন ওয়ার্ডে রোগীরা অনেক সেনসেটিভ হয়। তাই তাদের ড্রেসিংও করতে হয় যত্নের সঙ্গে।

বার্ন ইউনিটে মো. রিপন (৩০) নামের এক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮ দিন ধরে। নোয়াখালী জেলার সোনাপুরে তার বাড়ি। পেশায় সিএনজি অটোরিকশা চালক তিনি। বিদ্যুতের শকে তার হাত জ্বলে যায়। হাতটি শক্ত হয়ে গুটিয়ে যায়। পরে বার্ন ওয়ার্ডে নিয়ে আসলে ড্রেসিং করানো হয়। ড্রেসিং করান দু’জন স্পেশাল বয়।

রিপনের বড় বোনের জামাই সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রাম প্রতিদিন বলেন, ‘ড্রেসিং বাবদ প্রথম দিন ১২০০ টাকার ওষুধ, মলম, গজ, ব্যান্ডেজ কিনে দিই। একদিন পর ব্যান্ডেজ খোলা হলে দেখা যায়, ড্রেসিংয়ের জায়গাটি শুকায়নি। তারপর ১২ হাজার ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন কিনে আনার স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয় ওয়ার্ড থেকে। দেওয়া হয় একগাদা টেস্ট। রিপনের কিছু টেস্ট মেডিকেল থেকে আর অন্যগুলো বাইরের ল্যাব থেকে করানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুনরায় ড্রেসিংয়ের পর রিপনকে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়। এর পরের বার ব্যান্ডেজ খুলে দেখা যায়, মাংস পঁচে গেছে। তখন ডাক্তাররা জানান, রিপনের হাত কেটে ফেলতে হবে। এরপর আবারও ধরিয়ে দেওয়া হয় অন্য কিছু টেস্ট। পরের বার ব্যান্ডেজ খোলার পর হাতের অবস্থা আগের চেয়ে বেশি খারাপ হলে ডাক্তারদের সিদ্ধান্তে রিপনের হাতের অর্ধেক কেটে ফেলা হয়।’

ভর্তির শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭৮ হাজার টাকার মত খরচ হয়েছে বলে জানান সাইফুল ইসলাম।

তবে অপারেশনের পরও রিপনের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বিষণ্ন চেহারায় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন রিপন। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আগুনে আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

এসব বিষয়ে জানতে কথা হয় বার্ন ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমদের সঙ্গে। তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। আর নার্স-ডাক্তাররা মিলে ড্রেসিং করবেন, এটাই নিয়ম। এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’

এদিকে ওয়ার্ড থেকে রোগীদের যেসব ওষুধ দেওয়া কথা, তা রোগীরা পান না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এছাড়া ভর্তির পরপরই রোগীর স্বজনদের পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয় বাইরের দোকান থেকে। এমনটা হয়েছে জানান কক্সবাজারে ট্রলারে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ নিজাম উদ্দিনের ক্ষেত্রেও। তার বড়ভাইও ওই ট্রলারে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভর্তির পর থেকে এখনও পর্যন্ত ১২ হাজার টাকার ওষুধ কেনা হয়েছে। নার্সদের ব্যবহার খারাপ, ডাকলে রোগীর কাছে আসেন না তারা। কিছু বললেই বলেন, রোগীর অবস্থা খারাপ। বাইরে নিয়ে যান।’

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়ার্ডের দাযিত্বরত নার্স ইনচার্জ সাথী আক্তার। তিনি চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা সরকারি সাপ্লাইয়ের সব ওষুধ রোগীদের দিই। রোগীদের না দিলে এত ওষুধ যায় কোথায়?’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!