চট্টগ্রাম মেডিকেলে গুরুতর রোগী বাঁচে না সময়ক্ষেপণে, ওয়ানস্টপ কেয়ারেই রোগী যায় যায়

দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা পেতেই লেগে যায় অনেক সময়

0

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় গাড়ির ধাক্কায় আহত এক লোককে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে ফিরোজ নামের এক পথচারী এগিয়ে এসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এর বেশ অনেকক্ষণ পর লোকটিকে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করানোর কিছু সময় পর তিনি মারা যান। গত ২৫ এপ্রিল রাতের এই ঘটনা জেনে সেই পথচারী ফিরোজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগােযোগ করা হলে তিনি জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেলের জরুরি বিভাগে জরুরি চিকিৎসা দিলেই আহত ওই লোকটি বেঁচে যেতেন। কিন্তু জরুরি বিভাগের ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারে এ-টেবিল থেকে ও-টেবিল করতে করতেই অর্ধেক সময় চলে গেছে। পরে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ে গেলেও ডাক্তার আসার আগেই লোকটি মারা যান।

এটি শুধু একদিনের ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন কিছুও নয়। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া আহত ব্যক্তিরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আসলে রোগীদের পড়তে হয় ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারের নানা নিয়মের ম্যারপ্যাচে। দুর্ঘটনাটি পুলিশ কেস হওয়ায় পুলিশের খাতায় রেজিস্ট্রি হয়ে ডাক্তার দেখে রোগীকে যখন ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন রোগীর অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় চরম সংকটাপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চট্টগ্রাম মেডিকেলে চলে আসছে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ বা ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারের চিত্র এরকমই যে, গুরুতর আহত কোনো রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হুইল চেয়ার এনে জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসারের কক্ষের সামনে রাখা হয়। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা— কখন আসবে ডাক্তারের ডাক? সেই অপেক্ষা শেষে সংকেত যখন মিলল, রোগী তখন অচেতন। জরুরি বিভাগের ব্রাদার এসে রোগীকে গজ-ব্যান্ডেজ লাগিয়ে ২৬ কিংবা ২৮ নং ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে গিয়ে ওয়ার্ডে ঢোকার পর ইন্টার্নি ডাক্তার এসে আহত সেই ব্যক্তিকে দেখতে আসেন আরও আধঘন্টা পর। হাসপাতালে আসা ও চিকিৎসা শুরু করার সময় লেগে যায় প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘন্টা। দীর্ঘ এ সময়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় আহত ব্যক্তির। পরদিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত ব্যক্তিগুলো মারা গেছেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৬ ও ২৮ নং ওয়ার্ডে এমন অনেক ব্যক্তির খোঁজ মিলেছে— যাদের দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারলে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতো না। অনেককে বিদায় নিতে হতো না পৃথিবী থেকে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৬ নম্বর অর্থোপেডিকস ওয়ার্ডটি ‘হাড়ভাঙ্গা ওয়ার্ড’ নামে পরিচিত। সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্য দুর্ঘটনায় হাড়ভাঙ্গা রোগীদের চিকিৎসার জন্য এ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এ ওয়ার্ডে গেলে দেখা যাবে, পুরো ওয়ার্ডজুড়ে ওয়ার্ড বয়দের ছুটোছুটি। ডাক্তার ও নার্সরা তাদের নিজস্ব রুমে বসে বেশিরভাগ সময় অলস সময় কাটান বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় এদের অনেকে দায়িত্বেই থাকেন অনুপস্থিত। এই সুযোগে ওয়ার্ডের ভেতরেই ‘মিনি অপারেশন থিয়েটার’ বানিয়ে প্রকাশ্যেই সব ধরনের সার্জারি করে থাকেন ওয়ার্ডবয়রা।

রোগীর সার্জারি কাজে ব্যবহৃত ইট-রড-গজ-ব্যান্ডেজ সব কিনতে হয় রোগীর টাকাতেই। আর ওয়ার্ডজুড়ে গিজগিজ করা দর্শনার্থী থাকার সুযোগ করে দিয়ে ওয়ার্ডবয়রা রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে নিচ্ছেন বাড়তি টাকা। চিকিৎসকরা রোগীকে দেখে পরীক্ষা নিরীক্ষা কোন্ ল্যাবে করবেন তার একটা স্লিপ ধরিয়ে দেন। কাজের কাজ বলতে গেলে এটাই করতে দেখা গেছে চিকিৎসকদের।

সারা বছরই চট্টগ্রাম মেডিকেলের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্র এরকম। এ ওয়ার্ডের চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনদের অনেকেই ক্ষোভের সাথে এ প্রতিবেদককে জানান, ওয়ার্ডবয়দের হাতে জিম্মি তারা। বড় অভিযোগ এটাও— কাটাছেঁড়া কিংবা ড্রেসিংয়ের কাজে গুণতে হয় রোগীদের নগদ টাকা। আর ওয়ার্ডবয়রা রোগীর কাছ থেকে চাহিদামতো টাকা আদায় করতে না পারলে খুব খারাপ আচরণ করেন।

জানা গেছে, গত ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ২৬ নম্বর অর্থোপেডিকস ওয়ার্ডে ৮৮টি সিটের বিপরীতে রোগী ভর্তি আছে ২৫০ জন। কোনো কোনোদিন এই সংখ্যা ২৬০ থেকে ২৭০ জনও ছাড়িয়ে যায়।

জানা গেছে, ২৬ নম্বর অর্থোপেডিকস সার্জারি ওয়ার্ডে সার্জারির কাজ করে থাকেন ২০ থেকে ২৫ জন ওয়ার্ডবয়। ওয়ার্ডে সহকারী রেজিস্ট্রার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার, এমডি শিক্ষার্থী, ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ কর্মরত আছেন ২৫ জন চিকিৎসক। প্রতি শিফটে তাদের দায়িত্ব পালনের নিয়ম থাকলেও বেশিরভাগ সময়েই সেই দায়িত্বে কেউ থাকেন না— এমন অভিযোগ মিলেছে রোগীদের কাছ থেকে।

২৬ নম্বর অর্থোপেডিকস সার্জারি ওয়ার্ডের সামনে রয়েছে মিনি ওটি বা অপারেশন থিয়েটার। সেখানে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের নিয়ে গিয়ে সার্জারি করার নিয়ম কর্মরত চিকিৎসকদের। কিন্তু সেখানে সার্জারির কাজ করেন ওয়ার্ড সর্দার আব্দুর রউফ, সুইপার তপন দাশসহ আরো জনাদশেক এলএমএস পদবির কর্মচারী। সঙ্গে রয়েছেন ওয়ার্ডবয়। এ ওয়ার্ডবয়দের মধ্যে ৫ থেকে ৭ জন হাসপাতাল থেকে সংযুক্ত হলেও বাকিদের সবাই চুক্তিভিত্তিক।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এসব সমস্যা হাসপাতালের ক্রনিক ডিজিজ হয়ে গেছে। একদিনে তো আর সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না। আমি চেষ্টা করছি ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারটাকে শতভাগ কার্যকর করতে। আর ওয়ার্ডের অনিয়মগুলো নিয়ে আমি কয়েকবার সতর্ক করেছি। আবারও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।’

দুর্ঘটনাজনিত সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাই চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘জরুরি সেবা বলতে এদেশে প্রাথমিক চিকিৎসাকে বোঝানো হয়। কিন্তু জরুরি সেবা দিতে হলে প্রশিক্ষিত লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার। কিন্তু সেটা সেভাবে মেলে না। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনার পর শুধুমাত্র জরুরি চিকিৎসাসেবা না মেলায় আহত অনেক ব্যক্তিকে হারাতে হচ্ছে শরীরের মূল্যবান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।’

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ বা সিআইপিআরবির নির্বাহী পরিচালক ডা. একেএম ফজলুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা পেতে অনেক সময় লেগে যায়। জরুরি মেডিকেল সার্ভিস বলতে আমরা যা বলি, উন্নত বিশ্ব যেটা ঘটে— যদি একটা দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে প্রথমেই একটা কল সেন্টারে ইনফর্ম করা হয়। এরপর প্রশিক্ষিত জনবল পাঠিয়ে আহত ব্যক্তিটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ব্যবস্থা করে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে যতটুকু চিকিৎসা দেওয়া দরকার তা দিয়ে হাসপাতালে সঠিকভাবে ট্রান্সফার করা হয়। হাসপাতালে জরুরি বিভাগে লোক রেডি থাকে। তারা সেখানেই জরুরি কক্ষে চিকিৎসা দেওয়ার পরই যদি দরকার হয়, তাহলে ইনডোরে ভর্তি করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে সমন্বিতভাবে এই তিনটা বিষয় গড়ে ওঠেনি। উন্নত বিশ্বে প্যারামেডিক বলে আলাদা ইউনিট থাকে। কোনো দুর্ঘটনায় প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত এই বিশেষ কর্মীরা। তেমন একটি ইউনিট তৈরি খুবই জরুরি।

এদিকে চট্টগ্রামে বেশিরভাগ ক্লিনিক ও হাসপাতালে জরুরি বিভাগ নেই। কিছু ক্লিনিক বা হাসপাতালে ইমারজেন্সি বলে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও সেখানে গুরুতর ঘটনার জরুরি চিকিৎসা মেলে না। বড়জোর কাঁটাছেড়ার ব্যান্ডেজ মেলে।

অথচ ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং চিকিৎসা না পেলে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি কোথায় অভিযোগ করবে সে বিষয়ে নীতিমালা করতেও সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বেশিরভাগ প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালে জরুরি বিভাগ চালু করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছেন খোদ মালিকরাই। এক্ষেত্রে তাদের অনেকেই মনে করেন, জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তি করালে মামলার মতো অহেতুক ঝামেলায় জড়ানো হতে পারে। অথচ ২০১৬ সালে দেওয়া হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য যেকোনো হাসপাতাল। আইনি জটিলতার আশংকায় চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকার করা যাবে না বলেও নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm